১৯৮২ সালের ২৫ জুন। স্পেনের গিজন শহরের এল মোলিনন স্টেডিয়ামে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার বিশ্বকাপ ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে নেয় এক কালো অধ্যায় হিসেবে—যা পরে পরিচিত হয় ‘গিজনের কলঙ্ক’ নামে।
গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচটি শুরুর আগেই দুই দল বুঝে গিয়েছিল সমীকরণ। জার্মানি যদি ১-০ গোলে জেতে, তাহলে দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে, আর বিদায় নেবে আলজেরিয়া। সেই লক্ষ্যেই মাঠে নামে দুই দল।
ম্যাচের ১১ মিনিটে হর্স্ট হ্রুবেশ গোল করলে পরিস্থিতি পরিষ্কার হয়ে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় ফুটবলবিহীন এক ম্যাচ—না ছিল আক্রমণ, না ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই দল যেন বল পাস করেই সময় কাটাতে থাকে।
স্কটিশ রেফারি বব ভ্যালেন্টাইন পরে জানান, শুরুতে তিনি বুঝতেই পারেননি কী ঘটছে। তার ভাষায়, কোনো ট্যাকল বা আক্রমণ না দেখে তিনি দ্রুতই সন্দেহে পড়ে যান এবং বুঝতে পারেন ম্যাচটি স্বাভাবিকভাবে চলছে না।
স্টেডিয়ামের প্রায় ৪১ হাজার দর্শকও দ্রুতই বিষয়টি বুঝে যায়। গ্যালারি থেকে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ, বাঁশি আর বিদ্রূপ। কেউ রুমাল নাড়ায়, কেউ প্রতিবাদে পতাকা পোড়ায়। টেলিভিশন ধারাভাষ্যকাররাও এটিকে ফুটবলের সবচেয়ে লজ্জাজনক মুহূর্তগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেন।
পরবর্তীতে এই ম্যাচকে সরাসরি ‘নিশটআংগ্রিফস্পাক্ট ফন গিজন’ বা ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ নামে অভিহিত করা হয়। অনেকেই একে কার্যত ম্যাচ ফিক্সিং হিসেবেই উল্লেখ করেন।
আলজেরিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই সমীকরণে। তারা জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় পেলেও শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ে যায়। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে, এমনকি রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে রেফারি বব ভ্যালেন্টাইন নিজের অবস্থানে অটল থাকেন। তার মতে, রেফারির কাজ নিয়ম প্রয়োগ করা, খেলোয়াড়দের জোর করে আক্রমণ করানো নয়। একই সঙ্গে তিনি সেই রাতে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই ঘটনার পরই বিশ্বকাপের নিয়মে বড় পরিবর্তন আসে। ফিফা সিদ্ধান্ত নেয়, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো এখন থেকে একই সময়ে আয়োজন করতে হবে, যাতে কোনো দল অন্য ম্যাচের ফল জেনে সুবিধা নিতে না পারে।
আজও গিজনের সেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে এক বড় শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়—যেখানে কৌশল আর হিসাব-নিকাশ খেলার নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে গেলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তারই এক বাস্তব উদাহরণ।
স্পোর্টস ডেস্ক 
























