দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরে গাড়ি আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের উচ্চমূল্য, ব্যাংকের কড়াকড়ি এবং দেশের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় চলতি বছরের মার্চে গাড়ি খালাসের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। এতে বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩১টি জাহাজে করে মোট ১৪ হাজার ১৬৪টি গাড়ি দেশে আসে। এর মধ্যে গত বছরের মার্চ মাসেই বন্দর থেকে খালাস হয়েছিল এক হাজার ৯৫৯টি গাড়ি, যা ছিল রেকর্ড। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে মোট গাড়ি খালাস হয়েছিল তিন হাজার ৮৫৪টি।
তবে চলতি বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছরের মার্চে যেখানে এক হাজার ৯৫৯টি গাড়ি খালাস হয়েছিল, সেখানে এবারের মার্চে খালাস হয়েছে মাত্র ৪৯৭টি গাড়ি। সাধারণত জাতীয় বাজেটের আগে জুন মাস ঘিরে বন্দরে গাড়ি খালাসে ব্যস্ততা দেখা গেলেও এবার সেই চিত্র নেই বললেই চলে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৯৫০টি গাড়ি আমদানি হলেও মার্চ থেকে তা দ্রুত কমতে শুরু করে।
তার ভাষ্য, বৈশ্বিক সংকটের কারণে অর্থনীতিতে মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন বিলাসপণ্য কেনার বদলে প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় সীমিত রাখতে চাইছে, যার প্রভাব পড়েছে গাড়ির বাজারে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, একটি গাড়ি আমদানিতে বর্তমানে ৮০০ থেকে ৮৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের দাম বৃদ্ধি, এলসি খোলায় ব্যাংকের কড়াকড়ি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা।
তাদের দাবি, ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ায় অনেক গাড়ি শোরুম কিংবা বন্দরে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে প্রতিদিন সুদের চাপ বাড়ছে।
আমদানিকারকদের মতে, একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে বিক্রি না থাকায় ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকে ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির সময়সীমা বাড়ানো, শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর অবচয় সুবিধা বৃদ্ধি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে গাড়ি শুধু বিলাসপণ্য নয়, বরং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। তাই শুল্ক কমিয়ে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে গাড়ি আনতে পারলে বাজারে গতি ফিরতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো এলসি সুবিধা সহজ করলে আমদানি পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হতে পারে। অন্যথায় চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ঝুঁকিতে পড়বে।
গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সহসভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে সময়মতো এলসি খোলা যাচ্ছে না। পেমেন্ট প্রক্রিয়াতেও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়ায় শোরুমে গাড়ি বিক্রি প্রায় স্থবির। কিন্তু ব্যাংকঋণ, শোরুম ভাড়া ও পরিচালন ব্যয় নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইন ডেস্ক 

























