বাংলাদেশ ০৯:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
শিরোনামঃ
Logo তেজগাঁও কলেজে বিএমবি ডিপার্টমেন্ট প্রধানের হজ্জ যাত্রায় দোয়া ও মাহফিল অনুষ্ঠিত Logo আমরা এনেছি লাল কার্ড: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী Logo শেরপুরে পুলিশের জালে মাদক কারবারি, উদ্ধার ৬৭৫ ইয়াবা Logo গাইবান্ধায় এক কুকুরের কামড়ে ৪ জনের মৃত্যু Logo বাগমারায় উন্নয়ন কমিটি ঘোষনা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে স্থানীয় সাংসদের মতবিনিময় Logo ডিনস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করলেন পাবিপ্রবির ৩৮ শিক্ষার্থী Logo ‘চলচ্চিত্রে কিছু মশা জন্মেছে’—কার দিকে ইঙ্গিত ওমর সানীর? Logo মুক্তির এক দিন আগে ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’-এর সেন্সর সনদ বাতিল Logo ফুলপ্রেমী কেয়া আর স্বপ্নবাজ তৌসিফের ‘অবশেষে তুমি এলে’ Logo আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে বড় উন্নতি শান্ত-নাহিদের

আসিফ নজরুলের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে মাইকেল ও রমজানের শতকোটি টাকার বাণিজ্য

বামে মাইকেল, মধ্যখানে আসিফ নজরুল ও ডানে রমজান। (ছবিঃ সংগৃহীত)

সাব-রেজিস্ট্রার বদলিকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যের কারিগর মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান ও খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ।

অভিযোগ রয়েছে, গেল ২০২৪ এর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর ২৭ আগস্ট নিজেদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের আধিপত্যের জানান দেন রমজান-মাইকেলের নেতৃত্বাধীন BRSA (বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন)। পরবর্তীতে নির্বাচন ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাব বিস্তারকারী সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কথিত ক্যাশিয়ার রমজান কমিটি পুনরায় সক্রিয় হয়। সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে থাকা রমজান খান তার ঘনিষ্ঠ সহচর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাইকেল মহিউদ্দিনকে সামনের কাতারে নিয়ে আসেন।

উচ্চশিক্ষিত ও সজ্জন হিসেবে পরিচিত সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল খোরশেদের নেতৃত্বাধীন কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১২ জানুয়ারি নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমানকে নামমাত্র সভাপতি করে ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত সভাপতি হিসেবে সার্বিক দায়দায়িত্ব পালন করেন মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান। অন্যদিকে, মহাসচিবের দায়িত্ব নিয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ সাব-রেজিস্ট্রারদের একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন করে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন।

পতিত শেখ হাসিনা সরকার আমলেও নানা দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত ছিলেন স্বঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা মাইকেল মহিউদ্দিন। ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, টঙ্গী, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন নিতে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ গোপন সিঁড়িতে হাতবদল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাব-রেজিস্ট্রারদের ভাষ্যমতে, এসব পদায়নে প্রত্যেকবার ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। তৎকালীন শেখ হাসিনা ও আনিসুল হকের প্রিয়জন হিসেবে খ্যাত ‘নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সম্রাট’ রমজান খানের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় মাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পায়নি নিবন্ধন অধিদপ্তর।

সরকার পতনের পর আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে এবং পরে বিশেষ চুক্তি ও শর্তসাপেক্ষে শতকোটি টাকার লেনদেনের মাধ্যমে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে বহুমুখী ফায়দা লুটে নেন রমজান খান ও মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। যদিও পরবর্তীতে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা মাইকেলের হাতে চলে গেলেও প্রভাববলয়ে থেকেই যান রমজান খান। এর ফলে রমজান খান নিজেও বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে থাকেন। তিনি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের সময় নিয়ম ভেঙে এ-গ্রেড পোস্টিং নেন এবং মুন্সিগঞ্জেই জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন নেন, যা রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। একইভাবে মাইকেল মহিউদ্দিন ঢাকার টাকার ডিপো হিসেবে পরিচিত “খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার” পদে দায়িত্ব নেন।

অভিযোগ রয়েছে, নতুন কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়ে তা মাইকেলের মাধ্যমে আসিফ নজরুলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো রমজানের পরামর্শে। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা পূর্ণ মেয়াদ তো দূরের কথা, এক মাসের মধ্যেই নতুন পদায়ন পেতেন। এভাবেই চলতে থাকে আসিফ নজরুল-রমজান-মাইকেল চক্রের অভিনব বদলি বাণিজ্য।

ঢাকার গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে এই বদলি বাণিজ্যের আলোচনা হতো বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লেনদেনের বড় একটি অংশ যেত আসিফ নজরুলের কাছে। বদলির পর উক্ত পদে টিকে থাকতে সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারদের মাসে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দিতে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত মাসোহারার অর্থ না দিলে বদলি বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো। কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে এমন অডিও রেকর্ড পাওয়ার দাবি করেছেন প্রতিবেদক।

এদিকে কমিটির বিভিন্ন সদস্যও এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লোভনীয় পদায়ন পেয়েছেন। যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোস্তফা চুয়াডাঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়, জাহাঙ্গীর আলম শেরপুর থেকে বাড্ডায় বদলি হন। সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মানিকগঞ্জের শিংগাইর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে আসেন। মো. আব্দুল বাতেন নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরে পদায়ন নেন। সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদনান নোমান এবং যুগ্ম সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনও লোভনীয় পদায়ন পান; সাজ্জাদ সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চলে আসেন।

ক্রীড়া সম্পাদক খায়রুল বাসার অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার বদলি হয়ে শেষ পর্যন্ত আশুলিয়ায় পদায়ন নেন। তার বিরুদ্ধে দলিল স্বাক্ষরের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও তিনি বহাল রয়েছেন। অন্যদিকে, আশুলিয়ায় পদায়িত খালেদা বেগম প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় মাত্র দুই মাসের মাথায় তাকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বদলি করা হয়।

এছাড়া যুগ্ম সম্পাদক খিদমতের দায়িত্বে থাকা মো. জাহিদুর রহমান গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে কক্সবাজার সদরে বদলি হন। কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও একই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোপন সূত্রে জানা যায়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গাজীপুর সদরের সাব-রেজিস্ট্রার ও কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেনের মাধ্যমে অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন করা হতো।

এ বিষয়ে ৭ এপ্রিল বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন। আবেদনের সঙ্গে ‘৮ মাসে ঘুষ লেনদেন শতকোটি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাসে (অক্টোবর ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫) নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন পান। জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিকে ছয় থেকে সাত মাসে তিন থেকে চারবার বদলি করা হয়েছে। অথচ বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেড অনুযায়ী পদায়নের নীতিমালা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে এই বদলি বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড মাইকেল-রমজান চক্রের বিরুদ্ধে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তেজগাঁও কলেজে বিএমবি ডিপার্টমেন্ট প্রধানের হজ্জ যাত্রায় দোয়া ও মাহফিল অনুষ্ঠিত

আসিফ নজরুলের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে মাইকেল ও রমজানের শতকোটি টাকার বাণিজ্য

প্রকাশিত: ১১:৫৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

সাব-রেজিস্ট্রার বদলিকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যের কারিগর মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান ও খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ।

অভিযোগ রয়েছে, গেল ২০২৪ এর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর ২৭ আগস্ট নিজেদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের আধিপত্যের জানান দেন রমজান-মাইকেলের নেতৃত্বাধীন BRSA (বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন)। পরবর্তীতে নির্বাচন ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাব বিস্তারকারী সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কথিত ক্যাশিয়ার রমজান কমিটি পুনরায় সক্রিয় হয়। সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে থাকা রমজান খান তার ঘনিষ্ঠ সহচর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাইকেল মহিউদ্দিনকে সামনের কাতারে নিয়ে আসেন।

উচ্চশিক্ষিত ও সজ্জন হিসেবে পরিচিত সাব-রেজিস্ট্রার ইমরুল খোরশেদের নেতৃত্বাধীন কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১২ জানুয়ারি নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমানকে নামমাত্র সভাপতি করে ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত সভাপতি হিসেবে সার্বিক দায়দায়িত্ব পালন করেন মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান। অন্যদিকে, মহাসচিবের দায়িত্ব নিয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ সাব-রেজিস্ট্রারদের একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন করে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন।

পতিত শেখ হাসিনা সরকার আমলেও নানা দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত ছিলেন স্বঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা মাইকেল মহিউদ্দিন। ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, টঙ্গী, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন নিতে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ গোপন সিঁড়িতে হাতবদল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাব-রেজিস্ট্রারদের ভাষ্যমতে, এসব পদায়নে প্রত্যেকবার ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। তৎকালীন শেখ হাসিনা ও আনিসুল হকের প্রিয়জন হিসেবে খ্যাত ‘নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সম্রাট’ রমজান খানের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় মাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পায়নি নিবন্ধন অধিদপ্তর।

সরকার পতনের পর আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে এবং পরে বিশেষ চুক্তি ও শর্তসাপেক্ষে শতকোটি টাকার লেনদেনের মাধ্যমে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে বহুমুখী ফায়দা লুটে নেন রমজান খান ও মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। যদিও পরবর্তীতে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা মাইকেলের হাতে চলে গেলেও প্রভাববলয়ে থেকেই যান রমজান খান। এর ফলে রমজান খান নিজেও বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে থাকেন। তিনি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের সময় নিয়ম ভেঙে এ-গ্রেড পোস্টিং নেন এবং মুন্সিগঞ্জেই জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন নেন, যা রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। একইভাবে মাইকেল মহিউদ্দিন ঢাকার টাকার ডিপো হিসেবে পরিচিত “খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার” পদে দায়িত্ব নেন।

অভিযোগ রয়েছে, নতুন কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়ে তা মাইকেলের মাধ্যমে আসিফ নজরুলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো রমজানের পরামর্শে। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা পূর্ণ মেয়াদ তো দূরের কথা, এক মাসের মধ্যেই নতুন পদায়ন পেতেন। এভাবেই চলতে থাকে আসিফ নজরুল-রমজান-মাইকেল চক্রের অভিনব বদলি বাণিজ্য।

ঢাকার গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে এই বদলি বাণিজ্যের আলোচনা হতো বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লেনদেনের বড় একটি অংশ যেত আসিফ নজরুলের কাছে। বদলির পর উক্ত পদে টিকে থাকতে সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারদের মাসে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দিতে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত মাসোহারার অর্থ না দিলে বদলি বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো। কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে এমন অডিও রেকর্ড পাওয়ার দাবি করেছেন প্রতিবেদক।

এদিকে কমিটির বিভিন্ন সদস্যও এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লোভনীয় পদায়ন পেয়েছেন। যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোস্তফা চুয়াডাঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়, জাহাঙ্গীর আলম শেরপুর থেকে বাড্ডায় বদলি হন। সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মানিকগঞ্জের শিংগাইর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে আসেন। মো. আব্দুল বাতেন নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরে পদায়ন নেন। সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদনান নোমান এবং যুগ্ম সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনও লোভনীয় পদায়ন পান; সাজ্জাদ সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চলে আসেন।

ক্রীড়া সম্পাদক খায়রুল বাসার অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার বদলি হয়ে শেষ পর্যন্ত আশুলিয়ায় পদায়ন নেন। তার বিরুদ্ধে দলিল স্বাক্ষরের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও তিনি বহাল রয়েছেন। অন্যদিকে, আশুলিয়ায় পদায়িত খালেদা বেগম প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় মাত্র দুই মাসের মাথায় তাকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বদলি করা হয়।

এছাড়া যুগ্ম সম্পাদক খিদমতের দায়িত্বে থাকা মো. জাহিদুর রহমান গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে কক্সবাজার সদরে বদলি হন। কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও একই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোপন সূত্রে জানা যায়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গাজীপুর সদরের সাব-রেজিস্ট্রার ও কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেনের মাধ্যমে অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন করা হতো।

এ বিষয়ে ৭ এপ্রিল বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন। আবেদনের সঙ্গে ‘৮ মাসে ঘুষ লেনদেন শতকোটি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাসে (অক্টোবর ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫) নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন পান। জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিকে ছয় থেকে সাত মাসে তিন থেকে চারবার বদলি করা হয়েছে। অথচ বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেড অনুযায়ী পদায়নের নীতিমালা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে এই বদলি বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড মাইকেল-রমজান চক্রের বিরুদ্ধে।