পর্দায় একসময় ভয়ংকর খলনায়ক হিসেবে দর্শকের নজর কেড়েছিলেন আশরাফুল হক ডন। নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের অত্যন্ত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা এই অভিনেতাকে দেখা গেছে অসংখ্য সিনেমায়। অথচ চলচ্চিত্রে পা রাখার আগে তাঁর জীবনধারা ছিল একেবারেই ভিন্ন। ধর্মপ্রাণ পরিবেশে তিনি একটি মসজিদে নিয়মিত মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন এবং সেখানে আজান দিতেন।
সময়ের পরিক্রমায় ডনের জীবন পুরোপুরি বদলে যায় এবং ঢালিউডে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে বহু বছর পর এই অভিনেতা আবারও খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলাকে ঘিরে।
রোববার (৯ আগস্ট) সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন হককে আটকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বর্তমানে রিমান্ডে নিয়ে তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর সুদীর্ঘ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি সালমান শাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা অজানা দিক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৭১ সালে বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ডন। দশ ভাই-বোনের পরিবারে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বগুড়া থেকে ঢাকায় আসার পর বিশিষ্ট নির্মাতা সোহানুর রহমান সোহানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁর হাত ধরেই রুপালি পর্দায় অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয় ডনের।
সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘লাভ’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হলেও ডনের মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ছিল ঐতিহাসিক ব্লকবাস্টার ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। আর এই কালজয়ী সিনেমায় কাজের সূত্রেই চিত্রনায়ক সালমান শাহর সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তাঁর, যা পরবর্তী সময়ে রূপ নেয় গভীর বন্ধুত্বে।
সালমান শাহর সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে মুক্তি পাওয়া ২৭টি সিনেমার মধ্যে ২৪টিতেই খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ডন। নব্বইয়ের দশকে পর্দায় তাঁদের এই সংঘাত দর্শককে হলে টেনে নিয়ে যেত। ‘এ জীবন তোমার আমার’, ‘বিক্ষোভ’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘তোমাকে চাই’, ‘ফুলের মতো বউ’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘জীবন সংসার’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’ ও ‘মহামিলন’সহ অসংখ্য দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে স্মরণীয় অভিনয় করেন তিনি।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রায় ছয় শতাধিক সিনেমায় কাজ করেছেন ডন। সিনেমার বাইরে টেলিভিশন নাটক ও টেলিফিল্মেও সরব উপস্থিতি ছিল তাঁর। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও যুক্ত হন এবং ‘এক জনমের ভালোবাসা’ নামের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। এর বাইরে গানের প্রতি ভালোবাসার কারণে ‘আর্কাইভ’ নামে একটি ব্যান্ডও গঠন করেছিলেন তিনি।
সালমান শাহর অকালমৃত্যুর পর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বহুবার কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে ডনকে। একসময় মসজিদে আজান দিয়ে দিন শুরু করা সেই তরুণই পরবর্তীতে ঢালিউডের প্রতাপশালী খলনায়ক হয়ে ওঠেন; আর জীবনের শেষভাগে এসে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হত্যা মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে নতুন এক আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়লেন তিনি।
kalprakash.com/IM