‘নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬’ বাস্তবায়নে নতুন পদ্ধতিতে এগোচ্ছে সরকার। প্রজ্ঞাপন জারির পর সাতটি পৃথক এসআরওর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের তথ্য আইবাস প্লাস প্লাসে হালনাগাদ করে অনলাইনে নতুন বেতন নির্ধারণের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়া ইতোমধ্যে আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং প্রক্রিয়া শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সাতটি পৃথক বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ বা এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথকভাবে বেতন-ভাতা ও সংশ্লিষ্ট বিধান কার্যকর করা হবে।
অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রজ্ঞাপন জারির পরই বাস্তবায়ন কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কাঠামো প্রয়োগে থাকা প্রশাসনিক ও কারিগরি পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েই পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
আইবাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ হবে নতুন বেতন
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের অন্যতম বড় পরিবর্তন আসতে পারে বেতন নির্ধারণের ডিজিটাল ব্যবস্থায়। সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি-সংক্রান্ত তথ্য আইবাস প্লাস প্লাসে হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ব্যবস্থায় পদ, গ্রেড, মূল বেতন, চাকরিতে যোগদানের তথ্য, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তথ্য পূরণ ও যাচাই সম্পন্ন হলে নতুন পে-স্কেলের কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতা সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করা যাবে।
এর ফলে কর্মচারীরা নিজেদের তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বেতন কাঠামোয় আর্থিক অবস্থান জানতে পারবেন। পাশাপাশি বেতন নির্ধারণে কাগজপত্র ও হিসাবরক্ষণ অফিসের ওপর নির্ভরতা কমবে। ভুল হিসাব, দ্বৈত সুবিধা কিংবা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।
বর্তমানে আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বেতন, পেনশন, বাজেট ও হিসাব সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অনলাইন বেতন বিল, জিপিএফ, ঋণ, আয়কর এবং ইএফটির মাধ্যমে বেতন-পেনশন প্রদানের সুবিধাও রয়েছে এতে।
সাত শ্রেণির জন্য পৃথক এসআরও
নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ক্ষেত্রে যে সাতটি পৃথক এসআরও জারি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেগুলো হলো—
১. সিভিল বা বেসামরিক প্রশাসন — সাধারণ বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য।
২. পুলিশ বিভাগ — পুলিশ সদস্যদের বেতন, ভাতা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধার জন্য।
৩. বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) — বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক বিধান।
৪. ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান — সরকারি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কাঠামো।
৫. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান — বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য।
৬. সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ — সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য সংশ্লিষ্ট বেতন কাঠামো ও নির্দেশনা।
৭. বিচার বিভাগ — বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা ও বিচারকদের জন্য প্রযোজ্য কাঠামো।
অর্থাৎ একটি সাধারণ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মূল পে-স্কেল কার্যকর হলেও বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিস্তারিত প্রয়োগবিধি পৃথক এসআরওর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার কথা রয়েছে। ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোর পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, সরকারের সক্ষমতা থাকলে একবারেই নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সম্ভব; তবে প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নও বাস্তবসম্মত হতে পারে।
সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে শুধু বেতন বাড়ানো নয়, বরং ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন পুনর্নির্ধারণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।