আজকের কর্মব্যস্ত জীবনে সকালে ঘুম থেকে উঠে ঝটপট এবং পুষ্টিকর কী খাওয়া যায়, তা নিয়ে অনেকেই ভাবনায় পড়েন। তবে কলার মতো মিষ্টি ফল সকালে খালি পেটে খাওয়া শরীরের জন্য আদতে ভালো নাকি ক্ষতিকর, তা নিয়ে প্রায়ই নানা সংশয় ও বিতর্ক দেখা যায়। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ফুডে প্রকাশিত এক বিশেষ পুষ্টিবিষয়ক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, যেকোনো খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সকালে খালি পেটে কলা খাওয়া কেবল পেটই ভরায় না, এটি পরিপাকতন্ত্রের উন্নতি, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বিপাক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে চমৎকার ভূমিকা রাখে। তবে কিছু শারীরিক সংবেদনশীলতা ও নিয়ম বিবেচনা না করলে পড়তে হতে পারে অস্বস্তিতেও।
কলার পুষ্টিগুণ (প্রতি ১০০ গ্রামে) : যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যানুযায়ী, ১০০ গ্রাম ওজনের একটি মাঝারি আকারের পাকা কলায় রয়েছে—
-
ক্যালোরি : ৯৮ কিলোক্যালরি
-
কার্বোহাইড্রেট : ২৩ গ্রাম
-
ফাইবার : ৪ গ্রাম
-
পটাশিয়াম : ৩৫৮ মিলিগ্রাম
-
ম্যাগনেসিয়াম : ২৭ মিলিগ্রাম
-
ভিটামিন বি-৬ : ০.৪ মিলিগ্রাম
-
ভিটামিন সি : ৮.৭ মিলিগ্রাম
খালি পেটে কলা খাওয়ার ৫টি বড় উপকারিতা :
১. তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান : যুক্তরাজ্যের ম্যাক্রোবায়োটিক হেলথ কোচ ড. শিল্পা আরোরা জানান, কলা পটাশিয়াম, ফাইবার ও ম্যাগনেসিয়ামের চমৎকার উৎস। এতে থাকা প্রাকৃতিক গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ ও সুক্রোজ শরীরে দীর্ঘক্ষণ ক্লান্তিহীন শক্তির জোগান দেয়। ফলে প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো কোনো ক্লান্তি ছাড়াই দিনের শুরুতে বিপাক প্রক্রিয়া দারুণভাবে সক্রিয় হয়।
২. হজমশক্তি বৃদ্ধি ও পেটের সুরক্ষা : কলায় থাকা দ্রবণীয় ফাইবার (বিশেষ করে পেকটিন) কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পরিপাক প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও নিয়মিত করে। খালি পেটে কলা খেলে তা অ্যাসিডিটি প্রশমিত করে এবং পেট ফাঁপা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া কলা প্রাকৃতিক প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে শক্তিশালী করে সামগ্রিক হজমক্ষমতা বাড়ায়।
৩. রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখা : প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি হলেও কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মাঝারি (প্রায় ৪৮)। ফলে এটি রক্তে হঠাৎ শর্করা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে। আয়ুর্বেদিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডিম্পল জাঙ্গদার মতে, কলার সঙ্গে সামান্য বাদাম বা বীজজাতীয় খাবার খেলে রক্তে শর্করার ভারসাম্য আরও বেশি সুরক্ষিত থাকে।
৪. ক্ষুধা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ : একটি কলার উচ্চ ফাইবার পেটে গিয়ে খানিকটা প্রসারিত হয়, যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয়। এর ফলে অসময়ে অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স বা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
৫. হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ : কলার পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, পটাশিয়াম শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য রক্ষা করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করে ফোলাভাব কমায়।
কারা সতর্ক থাকবেন? ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক পুষ্টিবিদ ড. অঞ্জু সুদ জানান, কলা মূলত কিছুটা অম্লীয় বা অ্যাসিডিক প্রকৃতির এবং এতে উচ্চ মাত্রার পটাশিয়াম রয়েছে। যাঁদের আইবিএস (IBS), অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের তীব্র সমস্যা রয়েছে, তাঁদের খালি পেটে শুধু কলা খেলে পেট ফাঁপা বা সাময়িক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এ ধরনের জটিলতা এড়াতে কলার সঙ্গে সামান্য ভেজানো বাদাম, ড্রাই ফ্রুটস বা আপেল মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে পাকা কলার পরিমাপ বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে রাতের শেষভাগে বা ঘুমানোর ঠিক আগে কলা খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এ সময়ে বিপাক প্রক্রিয়া ধীর থাকায় তা হজমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
kalprakash.com/IM