রাজধানীর মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে—এমন অভিযোগ করেছে তার পরিবার। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই সংবাদকর্মী আহত এবং তাঁদের ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে হাসপাতাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত সাংবাদিকেরা হলেন মনির হোসেন ও মো. রাসেল সরকার। পরে তাঁরা শাহজাহানপুর থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
নিহত কিশোরীর স্বজনদের দাবি, গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তীব্র পেটব্যথা নিয়ে ১৩ বছর বয়সী মাহিমাকে মতিঝিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাফি করানো হলে তার অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে জানান স্বজনেরা।
স্বজনদের অভিযোগ, দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও সারা রাত অস্ত্রোপচার করা হয়নি। পরদিন শনিবার সকালে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগেই মাহিমার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে বলে অভিযোগ স্বজনদের। পরে মরদেহ গাজীপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে ওই রাতেই দাফন করা হয়।
পরিবারের দাবি, পরবর্তী সময়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের ডেকে ১০ লাখ টাকা এবং পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে পরিবার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
ঘটনার বিষয়ে জানতে সংবাদকর্মীরা হাসপাতালে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা এবং চাকরির প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
পরে বিচার দাবিতে হাসপাতালে আসা নিহতের স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লোকজনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সংবাদ সংগ্রহের কাজে থাকা সাংবাদিকদের ওপরও হামলা এবং তাঁদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ করেন আহত সংবাদকর্মীরা।
নিহত মাহিমার চাচাতো ভাই শাহরিয়ার সবুজ বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা অপারেশনের প্রস্তুতি নিলেও রাতে তা করেননি। এরপর আমার বোন মারা গেছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাইতে গেলে হাসপাতালের লোকজন আমাদের ওপর হামলা চালায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাকা বা চাকরির কোনো অফার আমরা চাইনি। তারা নিজেরাই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা কোনো ধরনের আপস চাই না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, রোগীর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালে ভাঙচুর চালিয়েছে। এতে হাসপাতালের অন্তত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছেন।
শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘একজন ১৩ বছর বয়সী কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জেনেছি।’
তিনি বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। দুই সাংবাদিক থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কিশোরীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগ—সবকিছু তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
kalprakash.com/IM