ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতার গভীর সীমাবদ্ধতাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর ফলে ওয়াশিংটনকে এখন এক কঠিন কৌশলগত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে—একদিকে শূন্য হয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠন, অন্যদিকে এশিয়া ও ইউরোপে সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘাতের জন্য সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার দ্বিমুখী সংকট।
যেকোনো যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল কেবল নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বা দখলকৃত ভূখণ্ডের আয়তন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর সামরিক সক্ষমতা, জাতীয় অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর যুদ্ধের প্রকৃত প্রভাব। এই প্রেক্ষাপটেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ফলে মার্কিন সমরাস্ত্র মজুতের সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণগুলো গভীর গুরুত্ব বহন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ইরানি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন তাদের অত্যাধুনিক ‘প্যাট্রিয়ট’ (Patriot) ও ‘থাড’ (THAAD) আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের বর্তমান উৎপাদন গতি অনুযায়ী এই বিপুল ঘাটতি পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম পাঁচ মাসেই যুক্তরাষ্ট্র তার অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। তথ্যে দেখা যায়, যুদ্ধের শুরুতে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভাণ্ডারে প্রায় ২ হাজার ৮০০টি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ছিল, যা জুলাইয়ের শেষ নাগাদ নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ১ হাজার ১০০টিতে নেমে আসে।
এই পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে কারণ মার্কিন অস্ত্র কারখানাগুলোর উৎপাদন গতি ব্যবহারের হারের তুলনায় অত্যন্ত মন্থর। যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে গড়ে প্রায় ৬২০টি প্যাট্রিয়ট এবং মাত্র ৯৬টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হতো। এই ধীরগতির উৎপাদন দিয়ে যুদ্ধকালীন ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ফলে প্যাট্রিয়টের মজুত যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে অন্তত কয়েক বছর এবং থাডের ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল লজিস্টিক বা রসদ সরবরাহের ঘাটতি নয়; বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা’ বা ডিটারেন্সের (deterrence) জন্য সরাসরি হুমকি। ওয়াশিংটনকে একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে নিরাপত্তা কৌশল সাজাতে হয়। একদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অন্যদিকে ইউরোপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে যাওয়ায় পূর্ব এশিয়া বা ইউরোপে বড় সংকট তৈরি হলে আমেরিকা তাৎক্ষণিক অস্ত্র সংকটে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে এ সংঘাত সামরিক ব্যয়ের এক অসম অর্থনৈতিক সমীকরণকেও সামনে এনেছে। প্রতিপক্ষের তৈরি কম খরচের ড্রোন ও সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে মিলিয়ন ডলার মূল্যের একেকটি ইন্টারসেপ্টর ছুড়তে হয়েছে। ফলে আক্রমণের খরচের তুলনায় প্রতিরক্ষার খরচ বহুগুণ বেড়ে গিয়ে মার্কিন সমরাস্ত্র ভাণ্ডারকে দ্রুত নিঃশেষ করে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ওয়াশিংটনের কৌশলগত সক্ষমতার এক বড় ধরনের অবক্ষয় ঘটিয়েছে। সামরিক শক্তির প্রদর্শন করতে গিয়ে ওয়াশিংটন আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছে—ভবিষ্যতে পূর্ব এশিয়া কিংবা ইউরোপে কোনো বড় সংকট দেখা দিলে নিঃশেষিত সক্ষমতা নিয়ে আমেরিকা কতটা কার্যকরভাবে ময়দানে দাঁড়াতে পারবে?
kalprakash.com/IM