দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে বিএনপি সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণের বাড়তি পরিশোধের চাপের মধ্যেও বর্তমান সরকার নিয়মিতভাবে এ দায় পরিশোধ করে যাচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে পরিশোধ করা এ অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ যাবৎকালে পাঁচ মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ। গত বছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার বা প্রায় ২৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আলোচ্য সময়ে সরকারের ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এ সময়ে সরকারকে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় পূর্ববর্তী সময়ে নেওয়া বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান কিস্তি পরিশোধ। তবে অর্থনৈতিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার নিয়মিতভাবে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের নামে নেওয়া বিপুল অঙ্কের বিদেশি ঋণের কিস্তি এখন পরিশোধযোগ্য হয়ে উঠেছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশের গ্রেস পিরিয়ড বা অবকাশকাল শেষ হওয়ায় বর্তমান সরকারের সময়েই আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের নামে ব্যাপকভাবে ঋণ নিয়েছে। কিন্তু এসব ঋণ নেওয়ার সময় প্রকল্পের ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুফল এবং ঋণের সুদের হার যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতেও ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন কারণে বিপুল আর্থিক দায় ও ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে। এখন আগের সরকারের রেখে যাওয়া এসব দায় বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। তারপরও সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিতভাবে এসব দায় পরিশোধ করে যাচ্ছে।’
আগের সরকার যত্রতত্র ঋণ নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার দেশি বা বিদেশি যেকোনো ধরনের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগ, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে গতিশীলতা বাড়ানোর জন্য ঋণের ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ঋণ নিলে তার বিপরীতে কী রিটার্ন আসবে এবং কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।’
বর্তমান সরকারের ঋণনীতিতে শুধু অর্থ সংগ্রহ নয়, বরং ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে অর্থনৈতিক সুফল কতটা পাওয়া যাবে, সেটিকেও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩৭ কোটি ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ আরও বেড়ে ৪৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদেশি ঋণ পরিশোধের বর্তমান চাপ মূলত সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে নেওয়া ঋণের কারণে নয়, বরং বিগত বছরগুলোতে নেওয়া বড় অঙ্কের প্রকল্প ঋণের কিস্তি এখন পরিশোধযোগ্য হয়ে ওঠায় সরকারের দায় বেড়েছে। আগের দেড় দশকে নেওয়া বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের অনেকগুলোর অবকাশকাল বা গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়েছে। ফলে একই সঙ্গে আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার একদিকে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের দায় নিয়মিত পরিশোধ করছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, নিয়মিত ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও ঋণদাতাদের কাছে দেশের দায় পরিশোধের সক্ষমতা এবং আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
kalprakash.com/IM