ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) আমদানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ পুনর্বহালের জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বারভিডার প্রেসিডেন্ট আব্দুল হক। পরে তিনিসহ সংগঠনের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যমান আমদানি নীতিতে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক ভেহিকেল আমদানির সুযোগ থাকলেও গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মোটরযান তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থেকে সাধারণ গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে সংগঠনটি মনে করে।
সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ জানান, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক ভেহিকেল সফলভাবে আমদানি ও রপ্তানি হচ্ছে। জাপান থেকে টয়োটা, নিসান, সুবারু, লেক্সাস ও হোন্ডার মতো খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের ব্যবহৃত গাড়ির পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও ইভি রপ্তানির প্রবাহ দ্রুত বাড়ছে।
বারভিডা জানায়, স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বহু দেশেই ব্যবহৃত ইভি আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, জর্জিয়া, নিউজিল্যান্ড, কেনিয়া, সৌদি আরব, আয়ারল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও কাজাখস্তানে নির্ধারিত বয়সসীমা ও নির্দিষ্ট শর্তাবলি মেনে ব্যবহৃত ইভি আমদানির অনুমতি রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইভি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ না করে নিরাপত্তা, পরিবেশগত মান, গাড়ির বয়স ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত ও শর্তসাপেক্ষে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির সুযোগ পুনর্বহালের আহ্বান জানায় বারভিডা।
সংগঠনটির মতে, নতুন ইলেকট্রিক গাড়ির বাজারমূল্য এখনো মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। তুলনামূলক কম দামে রিকন্ডিশন্ড ইভি বাজারে এলে সাধারণ ক্রেতাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এছাড়া ইভির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবহন খাতে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি চালুর সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির ক্ষেত্রে বারভিডা ৯টি নির্দিষ্ট শর্ত আরোপের প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত শর্তগুলো হলো— ১. প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পুরোনো ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির অনুমতি দেওয়া। ২. আমদানিকৃত গাড়ির ব্যাটারির ন্যূনতম ‘স্টেট অব হেলথ’ (SOH) ৭০ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা। ৩. ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষায় স্থানীয়ভাবে সংযোজিত, উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত নতুন ইভির ব্যাটারির স্থায়িত্ব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা। ৪. আমদানির পূর্বে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে গাড়ির কার্যকর পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা। ৫. বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, গুরুতর দুর্ঘটনা বা কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ইভি আমদানি না করা। ৬. ইভি ব্যাটারির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ‘ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও সেফ ডিসপোজাল ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রণয়ন করা। ৭. চার্জিং স্টেশন, সার্ভিসিং, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক ও রিসাইক্লিং খাতে প্রকৃত বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে শুল্ক ও করসংক্রান্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা। ৮. চলতি বাজেটে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের জন্য মূল্যস্তরভিত্তিক আরোপিত শুল্ক ও কর কাঠামো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা। ৯. নির্দিষ্ট সময় পরপর বাস্তবায়িত নীতির ফলাফল মূল্যায়ন করে গাড়ির বয়সসীমা ও অন্যান্য শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বারভিডার প্রেসিডেন্ট আব্দুল হক বলেন, ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনস্বার্থ ও পরিবেশের দিক বিবেচনা করে সরকার দ্রুত এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। তবে দাবি পূরণ না হলে রিকন্ডিশন্ড মোটরযান খাতের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং বৃহত্তর ক্রেতাগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় মানববন্ধন ও শোরুম বন্ধ রাখাসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
নেতৃবৃন্দ আরও উল্লেখ করেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ ইভি শিল্পের শক্ত ভিত্তি তৈরির স্বার্থেই একটি সমন্বিত ইভি নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার সেক্রেটারি জেনারেল রিয়াজ রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল মান্নান চৌধুরী খসরু, সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. হাবিব উল্লাহ ডন, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর, মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহা. সাইফুল ইসলাম সম্রাট, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ ডা. হাবিবুর রহমান খান, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ ফরিদ আহমেদসহ সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
kalprakash.com/IM