বাংলাদেশ ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি: সামাজিক চাপ ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে সতর্কতা

সংগৃহীত ছবি

আমাদের সমাজে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে একটি অপ্রত্যাশিত প্রথা গড়ে উঠেছে—নববিবাহিত মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু ও ঈদ উপহার পাঠানোকে অনেক জায়গায় বাধ্যতামূলক হিসেবে দেখা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিযোগিতা ও মানসম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় পশু এলো—এ নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও চাপ তৈরি হয়।

সামাজিক চাপ ও মানসিক জটিলতা

এ ধরনের রীতিতে বরপক্ষ ও কনেপক্ষ—দুই পক্ষই চাপের মধ্যে পড়ে। একদিকে বরপক্ষ মনে করে বড় উপহার পাওয়া উচিত, অন্যদিকে কনেপক্ষ সামাজিক সম্মানের ভয়ে সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও উপহার দিতে বাধ্য হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এটি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যৌতুকের রূপ নেয়, যা পরিবারে মানসিক চাপ ও বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কতা

ইসলামী দৃষ্টিতে জোরপূর্বক বা সামাজিক চাপের মাধ্যমে নেওয়া সম্পদ বৈধ উপার্জনের মধ্যে পড়ে না। কোরআনে অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)। একইভাবে হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্র ও হালাল জিনিসই গ্রহণ করেন (মুসলিম: ২২৩৬)।

এ কারণে জোরজবরদস্তি বা সামাজিক চাপের কারণে পাওয়া সম্পদ দিয়ে কোরবানি করলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

নিয়তের বিশুদ্ধতা ও ইখলাসের গুরুত্ব

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কিন্তু যখন এটি সামাজিক প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতার রূপ নেয়, তখন ইখলাস বা একনিষ্ঠতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, বরং পৌঁছে মানুষের তাকওয়া (সূরা হজ: ৩৭)।

যদি কোরবানি “কে কত বড় পশু দিল” এই প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অহংকার ও সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকি

যৌতুক বা চাপের মাধ্যমে পাওয়া উপহার অনেক সময় অহংকার ও সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করে। এতে এক পরিবার আরেক পরিবারের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর চেষ্টা করে, যা ইসলামে অপছন্দনীয় (সূরা লুকমান: ১৮)।

সমাজে কুপ্রথা শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা

এ ধরনের রীতি গ্রহণ করলে সমাজে ভুল বার্তা যায় যে বিয়েতে কনেপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা স্বাভাবিক। অথচ ইসলাম অন্যায় ও জুলুমে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে (সূরা মায়িদা: ২)।

উপসংহার

যদি কোনো উপহার সম্পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। তবে সামাজিক চাপ, প্রতিযোগিতা ও বাধ্যবাধকতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। কোরবানির মতো ইবাদতকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই বিশুদ্ধ রাখা উচিত—সামাজিক প্রদর্শনী নয়।

kalprakash.com/SS

ট্যাগ সমূহ:
জনপ্রিয় সংবাদ

যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি: সামাজিক চাপ ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে সতর্কতা

প্রকাশিত: ০৪:৫৮:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

আমাদের সমাজে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে একটি অপ্রত্যাশিত প্রথা গড়ে উঠেছে—নববিবাহিত মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু ও ঈদ উপহার পাঠানোকে অনেক জায়গায় বাধ্যতামূলক হিসেবে দেখা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিযোগিতা ও মানসম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় পশু এলো—এ নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও চাপ তৈরি হয়।

সামাজিক চাপ ও মানসিক জটিলতা

এ ধরনের রীতিতে বরপক্ষ ও কনেপক্ষ—দুই পক্ষই চাপের মধ্যে পড়ে। একদিকে বরপক্ষ মনে করে বড় উপহার পাওয়া উচিত, অন্যদিকে কনেপক্ষ সামাজিক সম্মানের ভয়ে সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও উপহার দিতে বাধ্য হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এটি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যৌতুকের রূপ নেয়, যা পরিবারে মানসিক চাপ ও বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কতা

ইসলামী দৃষ্টিতে জোরপূর্বক বা সামাজিক চাপের মাধ্যমে নেওয়া সম্পদ বৈধ উপার্জনের মধ্যে পড়ে না। কোরআনে অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)। একইভাবে হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্র ও হালাল জিনিসই গ্রহণ করেন (মুসলিম: ২২৩৬)।

এ কারণে জোরজবরদস্তি বা সামাজিক চাপের কারণে পাওয়া সম্পদ দিয়ে কোরবানি করলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

নিয়তের বিশুদ্ধতা ও ইখলাসের গুরুত্ব

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কিন্তু যখন এটি সামাজিক প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতার রূপ নেয়, তখন ইখলাস বা একনিষ্ঠতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, বরং পৌঁছে মানুষের তাকওয়া (সূরা হজ: ৩৭)।

যদি কোরবানি “কে কত বড় পশু দিল” এই প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অহংকার ও সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকি

যৌতুক বা চাপের মাধ্যমে পাওয়া উপহার অনেক সময় অহংকার ও সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করে। এতে এক পরিবার আরেক পরিবারের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর চেষ্টা করে, যা ইসলামে অপছন্দনীয় (সূরা লুকমান: ১৮)।

সমাজে কুপ্রথা শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা

এ ধরনের রীতি গ্রহণ করলে সমাজে ভুল বার্তা যায় যে বিয়েতে কনেপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা স্বাভাবিক। অথচ ইসলাম অন্যায় ও জুলুমে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে (সূরা মায়িদা: ২)।

উপসংহার

যদি কোনো উপহার সম্পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। তবে সামাজিক চাপ, প্রতিযোগিতা ও বাধ্যবাধকতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। কোরবানির মতো ইবাদতকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই বিশুদ্ধ রাখা উচিত—সামাজিক প্রদর্শনী নয়।

kalprakash.com/SS