বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় সচল করতে গঠিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে এ তহবিলের আওতায় গ্রাহককে ঋণ দিতে হলে ব্যাংকগুলোকে প্রথমে নিজেদের অর্থ ব্যবহার করতে হবে। ঋণ বিতরণের পর সেই অর্থ ফেরত পেতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পুনঃঅর্থায়নের আবেদন করতে হবে।
আগে এ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ পাওয়ার পর গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ঋণ বিতরণের আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে না ব্যাংকগুলোকে। তবে প্রাথমিক অর্থের সংস্থান করতে হবে নিজস্ব তহবিল থেকে।
এ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক্-অর্থায়ন স্কিম’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নতুন নিয়মে ঋণ বিতরণের আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অথবা পর্ষদের অনুমোদিত নির্বাহী কমিটির সম্মতি নিতে হবে। ঋণ বিতরণের পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্রসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩-এর পরিচালকের কাছে পুনঃঅর্থায়নের আবেদন জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে আবেদন করা সম্ভব না হলে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে অতিরিক্ত ১৫ দিন সময় পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া যে ব্যাংক থেকে কোনো গ্রাহক প্রকল্প ঋণ নিয়েছেন, সেই ব্যাংক থেকেই নতুন স্কিমের আওতায় ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। ঋণের অর্থের সব লেনদেন গ্রাহকের এসক্রো অথবা রেভিনিউ হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।
ঋণগ্রহীতার অতীত কর্মকাণ্ড যাচাইয়েও কঠোরতা আনা হয়েছে। অর্থপাচার, জালিয়াতি, ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া কিংবা তহবিলের অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না—এ মর্মে গ্রাহকের কাছ থেকে ঘোষণাপত্র নিতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
কেন বদলানো হলো ঋণ পদ্ধতি?
প্রাক্-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়নের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, ঋণ দেওয়ার আগে নাকি পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ পাওয়া যাবে। আগের ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে গ্রাহকদের ঋণ দিত। নতুন ব্যবস্থায় প্রথমে নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ করে পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অর্থ ফেরত পাওয়ার আবেদন করতে হবে।
অর্থাৎ, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়নের অর্থ ছাড় করবে।
২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলে ঋণ বিতরণে ধীরগতি
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে গত ৪ জুন ২০ হাজার কোটি টাকার এ স্কিম গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত চলতি মূলধনের সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
এ তহবিলের অর্থ দিয়ে কাঁচামাল কেনা, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ মেটানোর সুযোগ রয়েছে।
তিন বছর মেয়াদি আবর্তনযোগ্য এ তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ পাবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বড় অঙ্কের তহবিল গঠনের পরও ঋণ বিতরণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ স্কিমের আওতায় বিতরণ করা হয়েছে ৫৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আরও ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদন বা প্রক্রিয়াধীন ছিল।
বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন ঋণ মিলিয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। যা ২০ হাজার কোটি টাকার মোট তহবিলের মাত্র ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজ ও গতিশীল করতেই নতুন পদ্ধতি চালু করল বাংলাদেশ ব্যাংক।