ইসলামের দৃষ্টিতে যেসব অপরাধকে অত্যন্ত জঘন্য হিসেবে দেখা হয়, তার অন্যতম হলো চুরি। পবিত্র কোরআনে চুরির জন্য নির্ধারিত শাস্তির কথা এসেছে। একই সঙ্গে তাওবা ও সংশোধনের দরজাও খোলা রাখা হয়েছে।
চুরি করে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নেওয়া কিংবা চুরি করা সম্পদের কিছু অংশ দান করে দিলেই দায়মুক্ত হওয়া যায় না। কেননা, এটি অন্যের সম্পদের অধিকার লঙ্ঘন করে। এটি বান্দার হক। তাই আল্লাহর কাছে তাওবার পাশাপাশি চুরি করা সম্পদের মালিকের হক আদায় করাও জরুরি। চুরির গুনাহ থেকে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত তুলে ধরা হলো—
খাঁটি তাওবা করা: কোনো ব্যক্তি চুরি করার পর অনুতপ্ত হলে এবং এই পাপ থেকে মুক্ত হতে চাইলে তার প্রথম কাজ হলো মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করা। ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ আর না করার দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭০)
ফকিহগণ তাওবার মৌলিক শর্ত হিসেবে গুনাহ ত্যাগ করা, অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে পুনরায় গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। আর গুনাহের সঙ্গে যদি মানুষের অধিকার জড়িত থাকে, তাহলে সেই অধিকার আদায় করা বা অধিকারীর কাছ থেকে ক্ষমা নেওয়া তাওবার সঙ্গে যুক্ত হয়। (আত-তাওবাতু ওয়া শারাইতুহা, পৃ. ৪৩৬)
চুরি করা সম্পদ ফেরত দেওয়া: পবিত্র কোরআনের ভাষ্যমতে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার কোনো সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজদের মধ্যে তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
চুরি, ছিনতাই কিংবা অন্য কোনো অবৈধ পন্থায় মানুষের হক নষ্ট বা আত্মসাৎ করলে দায়মুক্তির পথ হলো তা ফেরত দেওয়া অথবা যেকোনো মূল্যে মালিকের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। অন্যথায় পরকালেও সেই সম্পদ ফেরত দিতে হবে।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে, সে যেন তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়, তার ভাইয়ের পক্ষে তার নিকট হতে পুণ্য কেটে নেওয়ার আগেই। কারণ সেখানে কোনো দিনার বা দিরহাম পাওয়া যাবে না। তার কাছে যদি পুণ্য না থাকে, তবে তার (মজলুম) ভাইয়ের গুনাহ এনে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫৩৪)
নাউজুবিল্লাহ! অন্যের হক নষ্ট করা কত বড় বিপদের বিষয়, তা এই হাদিস থেকে অনুমান করা যায়।
অতএব, চুরি করা জিনিস যদি এখনও বিদ্যমান থাকে, তাহলে মূল জিনিসটি মালিক বা তার ওয়ারিশদের ফিরিয়ে দিতে হবে। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া-উৎসগুলোতে বলা হয়েছে, চুরি করা বস্তু বিদ্যমান থাকলে সেটিই ফেরত দিতে হবে; আর বস্তুটি নষ্ট বা হারিয়ে গেলে তার মূল্য বা সমমূল্য মালিককে দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে)
প্রয়োজনে চুরির বিষয়টি প্রকাশ না করে অন্য কোনো অজুহাতেও মালিকের সম্পদ ফেরত দিতে হবে। কিংবা পরিচয় প্রকাশ না করেও কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে, ডাকযোগে, ব্যাংক বা মোবাইল লেনদেনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো উপায়ে সম্পদ ফেরত দেওয়া যেতে পারে। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত: ১১/১৩৪)
যদি যথাসাধ্য চেষ্টা করার পরও মালিক বা তার ওয়ারিশদের সন্ধান পাওয়া না যায়, তাহলে হানাফি ফিকহের একাধিক ফতোয়া-উৎসে ওই সম্পদ বা তার মূল্য গরিব-অসহায়দের সদকা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ৫/৮৮)
কেউ যদি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাৎ করে পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তা ফেরত দিতে চায়, তাহলে তার একটি পদ্ধতি হলো পুরো টাকা বা সম্পদের সমপরিমাণ মূল্য সরকারি ফান্ডে যেকোনোভাবে জমা করে দেওয়া এবং খাঁটি মনে তাওবা করা। (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত: ১০/৭৯)
মহান আল্লাহ সবাইকে চুরি ও আত্মসাতের মতো জঘন্য অপরাধ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন।
kalprakash.com/IM