বাংলাদেশ ০৪:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

চিংড়ির রেণুর তীব্র সংকট, বিপাকে হাজারো ঘের মালিক

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিংড়ি উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে চলতি মৌসুমে চিংড়ির রেণু (পোনা) তীব্র সংকটে পড়েছে। ঘেরে রেণু ছাড়ার নির্ধারিত সময় প্রায় শেষ হলেও অধিকাংশ চাষি প্রয়োজনীয় পোনার খুব সামান্য অংশ সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে প্রস্তুত ঘেরগুলোতে চাষ শুরু নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

একসময় রেণুর বেচাকেনায় সরগরম থাকা ফলতিতা বটতলা ও আশপাশের বাজারগুলো এখন অনেকটাই নির্জীব। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে রেণুর সরবরাহ অত্যন্ত কম, আর যে পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে তার দামও গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে রেণু সংগ্রহে সরকারি বিধিনিষেধ, পরিবহন ও বিপণনে কড়াকড়ি এবং হ্যাচারির সংখ্যা কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। এর প্রভাব শুধু চিংড়ি উৎপাদনেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পড়তে শুরু করেছে।

উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে বর্তমানে ৮ হাজার ৪টি বাণিজ্যিক ঘের এবং ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ের জন্য বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণুর প্রয়োজন হয়। তবে চাষি ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি; চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রেণুর প্রয়োজন।

নলধা, ঠিকরিপাড়া ও মূলঘর এলাকার বিভিন্ন ঘের ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগে ঘের প্রস্তুত করা হলেও রেণুর অভাবে অনেক চাষি এখনো মাছ ছাড়তে পারেননি। এতে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ঠিকরিপাড়ার চাষি দাউদ হায়দার বাবু জানান, এক একর ঘের প্রস্তুত করতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিবছর তিনি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়লেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করলেও পর্যাপ্ত রেণু না পাওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

রেণু ব্যবসায়ী শেখ মনি বলেন, গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার দাম বেড়ে ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। তিনি আরও জানান, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে অগ্রিম দেওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকার বিপরীতে এখনো কাঙ্ক্ষিত রেণু পাননি।

ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়তমালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকনের ভাষ্য, স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাষিরা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক রেণুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা মৎস্য চাষি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ফলতিতা বাজারে প্রায় ৫০০ মাছের আড়ত রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছের বেচাকেনা হয় এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক ও পরিবহনকর্মী এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০ হাজার ঘের ও পুকুরকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল।

মৎস্য বিভাগের হিসাবে, গত অর্থবছরে ফকিরহাটে ২ হাজার ৩১৫ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টন। তবে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম জানান, ২০১১-১২ সালে দক্ষিণাঞ্চলে ৭৮টি হ্যাচারি থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩৭টিতে নেমে এসেছে। এর ফলে রেণু উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু সংগ্রহ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণুর ব্যবহার বাড়াতে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৮ শতাংশ হওয়ায় সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম।

চাষিদের আশঙ্কা, দ্রুত রেণুর সরবরাহ বৃদ্ধি না পেলে শুধু উৎপাদনই নয়, দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।

kalprakash.com/SAS

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
চিংড়ির রেণুর তীব্র সংকট, বিপাকে হাজারো ঘের মালিক
জনপ্রিয় সংবাদ

চিংড়ির রেণুর তীব্র সংকট, বিপাকে হাজারো ঘের মালিক

প্রকাশিত: ০২:২৫:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিংড়ি উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে চলতি মৌসুমে চিংড়ির রেণু (পোনা) তীব্র সংকটে পড়েছে। ঘেরে রেণু ছাড়ার নির্ধারিত সময় প্রায় শেষ হলেও অধিকাংশ চাষি প্রয়োজনীয় পোনার খুব সামান্য অংশ সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে প্রস্তুত ঘেরগুলোতে চাষ শুরু নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

একসময় রেণুর বেচাকেনায় সরগরম থাকা ফলতিতা বটতলা ও আশপাশের বাজারগুলো এখন অনেকটাই নির্জীব। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে রেণুর সরবরাহ অত্যন্ত কম, আর যে পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে তার দামও গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে রেণু সংগ্রহে সরকারি বিধিনিষেধ, পরিবহন ও বিপণনে কড়াকড়ি এবং হ্যাচারির সংখ্যা কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। এর প্রভাব শুধু চিংড়ি উৎপাদনেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পড়তে শুরু করেছে।

উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে বর্তমানে ৮ হাজার ৪টি বাণিজ্যিক ঘের এবং ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ের জন্য বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণুর প্রয়োজন হয়। তবে চাষি ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি; চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রেণুর প্রয়োজন।

নলধা, ঠিকরিপাড়া ও মূলঘর এলাকার বিভিন্ন ঘের ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগে ঘের প্রস্তুত করা হলেও রেণুর অভাবে অনেক চাষি এখনো মাছ ছাড়তে পারেননি। এতে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ঠিকরিপাড়ার চাষি দাউদ হায়দার বাবু জানান, এক একর ঘের প্রস্তুত করতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিবছর তিনি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়লেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করলেও পর্যাপ্ত রেণু না পাওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

রেণু ব্যবসায়ী শেখ মনি বলেন, গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার দাম বেড়ে ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। তিনি আরও জানান, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে অগ্রিম দেওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকার বিপরীতে এখনো কাঙ্ক্ষিত রেণু পাননি।

ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়তমালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকনের ভাষ্য, স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাষিরা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক রেণুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা মৎস্য চাষি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ফলতিতা বাজারে প্রায় ৫০০ মাছের আড়ত রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছের বেচাকেনা হয় এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক ও পরিবহনকর্মী এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০ হাজার ঘের ও পুকুরকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল।

মৎস্য বিভাগের হিসাবে, গত অর্থবছরে ফকিরহাটে ২ হাজার ৩১৫ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টন। তবে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম জানান, ২০১১-১২ সালে দক্ষিণাঞ্চলে ৭৮টি হ্যাচারি থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩৭টিতে নেমে এসেছে। এর ফলে রেণু উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু সংগ্রহ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণুর ব্যবহার বাড়াতে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৮ শতাংশ হওয়ায় সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম।

চাষিদের আশঙ্কা, দ্রুত রেণুর সরবরাহ বৃদ্ধি না পেলে শুধু উৎপাদনই নয়, দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।

kalprakash.com/SAS

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
চিংড়ির রেণুর তীব্র সংকট, বিপাকে হাজারো ঘের মালিক