কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়াগামী এক ভয়ংকর মানবপাচার চক্রের নৃশংস কাহিনি সামনে এসেছে, যেখানে অপহরণ, প্রলোভন ও মুক্তিপণের ফাঁদে ফেলে শত শত নারী-পুরুষকে সমুদ্রপথে পাচার করা হয়। শেষ পর্যন্ত আন্দামান সাগরে একটি ট্রলার ডুবে অন্তত ২৬৪ জনের করুণ পরিণতি ঘটে, জীবিত উদ্ধার পান মাত্র ৯ জন।
৪ এপ্রিল ২০২৬ রাতে কক্সবাজারের বাহারছড়া এলাকা থেকে একটি মাছধরা ট্রলার রওনা দেয়। তবে সেটি ছিল মূলত মানবপাচারের জন্য ব্যবহৃত একটি নৌযান, যেখানে প্রায় আড়াই শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে গাদাগাদি করে তোলা হয়। অপহৃত ও প্রলোভনে পড়া মানুষদের নিয়ে শুরু হয় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রা।
চার দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ৭ এপ্রিল গভীর রাতে ট্রলারে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। পানির অভাব, নির্যাতন এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে যাত্রীদের মধ্যে হট্টগোল-মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হয়ে ডুবে যায় আন্দামান সাগরে। মুহূর্তেই শুরু হয় আর্তচিৎকার ও প্রাণ বাঁচানোর লড়াই।
ডুবে যাওয়ার পর অনেকেই কাঠ, ড্রাম ও ভাসমান বস্তু আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র স্রোতের সঙ্গে লড়াই করেন। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর একটি জাহাজ সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে। তাদের শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার ও টেকনাফ অঞ্চলে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ অপহরণ ও মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তারা সিএনজি ও টমটমে যাত্রী তুলে নির্জন স্থানে নিয়ে অপহরণ করে এবং পরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। অপহৃতদের পাহাড়ি এলাকায় বন্দি রেখে নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
পাচারচক্র অনেককে মুক্তিপণের মাধ্যমে ছাড়লেও আবার অনেকে বাধ্য হয়ে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে ওঠেন। সেখানে পৌঁছানোর পরও অনেক ভুক্তভোগী নতুন করে জিম্মিদশায় পড়ে যান এবং তাদের কাজের অজুহাতে বা সরাসরি বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক পরিবার এখনো নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। অনেক মা-বাবা ও স্ত্রী প্রতিদিন দরজার সামনে বসে প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন।
উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের ভাষ্যমতে, ট্রলার ডোবার আগে যাত্রীদের ওপর মারধর, খাবার ও পানির সংকট এবং চরম নির্যাতন চালানো হয়। এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে পাচারচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে, যাদের বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে।
কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ঘটনায় তদন্ত চালাচ্ছে এবং মানবপাচার চক্রের মূল হোতাদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংগঠিত মানবপাচার নেটওয়ার্কের ভয়াবহ চিত্র।
kalprakash.com/SS
অনলাইন ডেস্ক 
























