শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়নের গঙ্গাচন্না গ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবাশ্রমে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল হরিনাম মহাযজ্ঞ ও মতুয়া ধর্মাবলম্বীদের মহামিলন মেলা–২০২৬।
গত ১৬ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে ধর্মীয় আচার ‘অধিবাস’-এর মধ্য দিয়ে এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরদিন ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া মূল অনুষ্ঠান দুই দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, নামকীর্তন ও ভক্তদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
এই দুই দিনব্যাপী মহামিলন মেলায় লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দিরাঙ্গণসহ পুরো আশ্রম প্রাঙ্গণ। মতুয়া ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষের দলবদ্ধ উপস্থিতি, ঢাক-ঢোল ও ঝাঁঝরের তালে তালে নামসংকীর্তন—সব মিলিয়ে এক ভক্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যা আশপাশের পুরো এলাকাকে প্রকম্পিত করে তোলে।
আশ্রম প্রাঙ্গণে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘কামনা সাগর’ পুকুরকে ঘিরে ছিল ভক্তদের বিশেষ আকর্ষণ। ভোর থেকেই এখানে পবিত্র স্নানের জন্য উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পুকুরে স্নান করলে পাপ মোচন হয়—এমন বিশ্বাসে দূর-দূরান্ত থেকে আগত ভক্তরা এখানে স্নান করে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন।
এ আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও ভক্তদের সেবা-যত্নে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। কেউ বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেন, কেউ আবার বিশ্রামের জায়গা করে দেন—সব মিলিয়ে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতির কারণে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ফলে ভক্তরা নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় আচার পালন করতে সক্ষম হন।
বৈশাখী আমেজে মেলা প্রাঙ্গণে বসে নানা ধরনের দোকানপাট। খেলনা, মিষ্টি, গৃহস্থালির সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের পশরা সাজিয়ে শত শত দোকানি জমজমাট বেচাকেনা করেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বাগেরহাট জেলা, মোল্লাহাট উপজেলা এবং চিতলমারী উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ মন্দিরাঙ্গণ পরিদর্শন করেন। এ সময় নেতৃবৃন্দকে ফুলের মালা ও উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেন বাংলাদেশ মতুয়া বহুজন ঐক্য সমাজের সহ-সচিব, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সনাতন ধর্মের প্রতিনিধি, বাগেরহাট-১ আসনের ধানের শীষের কান্ডারী এবং বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবাশ্রম গঙ্গাচন্নার সভাপতি কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল।
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সেবাশ্রম কমিটির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীবন কুমার গাইনসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ।
এ আয়োজনের একটি বিশেষ মুহূর্ত ছিল বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান জেলা সমন্বয়ক এম এ সালামের শ্রীপাট গঙ্গাচন্নায় শুভাগমন। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে সুদূর বাগেরহাট থেকে তিনি এখানে উপস্থিত হন এবং বাগেরহাট-১ আসনের বিএনপির কান্ডারী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। জাতপাতের বিভেদ ভুলে একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার এই দৃশ্য উপস্থিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চিতলমারী উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব ঠান্ডু ও তার সহযোগীরা এ অনুষ্ঠান সফল করতে নিরলস ভূমিকা পালন করেন।
উল্লেখ্য, প্রতি বছরের ন্যায় বৈশাখ মাসের শুরুতে অশ্বিনী গোসাইয়ের স্মরণে এখানে এই ধর্মীয় মহোৎসব, নামকীর্তন ও প্রসাদ বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি 

























