বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৩৪ নং লক্ষীখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারে এক অস্বাভাবিক বাস্তবতা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চলমান। যেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের কথা, সেখানে একই ভবনে চলছে পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম। ফলে শিক্ষা পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হয়ে পড়েছে, আর শিশুদের মনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অজানা ভীতি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার তিনটি শ্রেণিকক্ষ দখল করে চলছে পুলিশের দাপ্তরিক কাজ। এর ফলে বাধ্য হয়ে নিচতলার গবাদি পশুর আশ্রয়স্থলে টিনের বেড়া দিয়ে অস্থায়ী তিনটি কক্ষ তৈরি করে সেখানে পাঠদান চালানো হচ্ছে। কিন্তু এসব কক্ষে নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নেই ফ্যান বা প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্লাস করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীরা রানী তাফালী জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১২৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য ন্যূনতম পাঠদানের পরিবেশও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “এক পাশে ক্লাস নিলে অন্য পাশের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। এতে বাচ্চাদের মনোযোগ নষ্ট হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও পরিবেশ না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।”
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ভবনের পিলারে ফাটল, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তার। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। স্কুলের বাথরুমগুলোও ব্যবহারের অযোগ্য—কোথাও পানি নেই, কোথাও দরজা ভাঙা। শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যদের জন্য থাকা একটি বাথরুমও অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, একই ভবনে ক্লাস, সালিশ বৈঠক এবং পুলিশের যাতায়াত—সব মিলিয়ে একটি “পুলিশি পরিবেশ” তৈরি হয়েছে। এতে শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। অনেক শিশু ভয়ে ভয়ে স্কুলে আসে, এমনকি লাইব্রেরিতে যেতেও তারা দ্বিধাবোধ করে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, “পুলিশ কাঁধে অস্ত্র আর শিক্ষার্থীর হাতে বই—এই দুইয়ের সমন্বয় কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়। শিশুরা এখানে মুক্তভাবে খেলাধুলা বা শেখার সুযোগ পাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান জানান, লক্ষীখালী অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির জন্য ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, “নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হলেই বিদ্যালয় ভবন থেকে পুলিশ ফাঁড়ি সরিয়ে নেওয়া হবে।”
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. শেফাইনূর আরেফিন বলেন, “একই ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম ও পুলিশি কার্যক্রম চলা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—১৬ বছর ধরে চলা এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির অবসান কবে? শিশুদের জন্য নিরাপদ, ভীতিমুক্ত ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে।
kalprakash.com/SS
প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি 





















