প্রথম শ্রেণি ছাড়া দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তিতে আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রায় ছয় বছর পর লটারি প্রথা বাতিল করে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে শিক্ষার্থী ভর্তির এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত—এই তিন বিষয়ের ওপর মোট ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য একটি নতুন খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করছে মাউশি। আগামী সপ্তাহেই খসড়াটি অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের পর্যালোচনার পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে নতুন ভর্তি নীতিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হবে।
প্রস্তাবিত খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। বিষয়ভিত্তিক মানবণ্টনে বাংলায় ৩০, ইংরেজিতে ৩০ এবং গণিতে ৪০ নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় মেধাতালিকা প্রস্তুত করে বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা হবে।
এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর ও প্রকাশ করা হবে।
এদিকে প্রায় ছয় বছর পর লটারি বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষা চালুর এই পদক্ষেপে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও অপর পক্ষ পুনরায় কোচিং বাণিজ্য ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপের আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
অনেক অভিভাবক মনে করছেন, প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লটারি পদ্ধতি বজায় রাখা সমীচীন হবে। তা সম্ভব না হলে অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লটারি বহাল রেখে ওপরের শ্রেণিতে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে শিক্ষাবিদদের অনেকে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে দুর্নীতি, প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়বে এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্য আরও গভীর হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, লটারি কিংবা ভর্তি পরীক্ষা—কোনোটিই শিক্ষার্থী ভর্তির সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। মূল সমাধান লুকিয়ে আছে প্রতিটি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিশ্চিত করার মধ্যে। সব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শ্রেণিকক্ষ, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও উপযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বজায় রাখা গেলে শিক্ষার্থীরা দূরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৌড়াবে না। এ ছাড়া মন্ত্রী ও আমলাসহ সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের বাড়ির পাশের বিদ্যালয়ে পড়া বাধ্যতামূলক করা হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মান দ্রুত উন্নত হতে বাধ্য।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে প্রথম লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ২০১২ সালে তা বেসরকারি স্কুলেও কার্যকর হয়। তখন দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষাই চালু ছিল। পরবর্তীতে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির প্রেক্ষাপটে সব শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। আসন্ন শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে দীর্ঘ ছয় বছর পর পুনরায় পরীক্ষার টেবিলে বসতে হবে স্কুলপড়ুয়াদের।
kalprakash.com/IM