চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অনিয়মিত বা অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পারাপারের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইউরোপে এ ধরনের অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। তবে সামগ্রিকভাবে সীমান্ত পারাপার কমলেও ভূমধ্যসাগরের প্রধান দুটি ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা।
ইউরোপের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের বহির্সীমান্তে প্রায় ৭৫ হাজার অনিয়মিত সীমান্ত পারাপারের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মানব পাচারকারীদের প্রধান যাত্রাস্থলগুলোতে উপকূলীয় নজরদারি জোরদার করার ফলে ইউরোপমুখী নৌকার সংখ্যা কমে আসছে বলে মনে করছে ফ্রন্টেক্স। তবে জুলাইয়ের শেষ দিকে মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা ছিটমহলে মানুষের অনিবন্ধিত প্রবেশের বিষয়টি এ পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি, কারণ তাঁদের বেশিরভাগই নথিভুক্ত হওয়ার আগেই ফিরে গেছেন।
একক মাস হিসেবে শুধু আগস্টেই প্রায় ১০ হাজার ৭০০টি অবৈধ সীমান্ত পারাপার শনাক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম। সাধারণত গ্রীষ্মকালে ভূমধ্যসাগরে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে প্রবেশের চাপ বাড়লেও এবার তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে ইইউর নতুন ‘প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’-এর আওতায় বহির্সীমান্তে কঠোর বায়োমেট্রিক ও মানসম্মত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।
প্রবেশের সংখ্যা কমলেও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে মানবিক বিপর্যয় কমেনি। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অন্তত ১ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ও চলাচলের অনুপযোগী নৌকায় অভিবাসীদের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রে পাঠিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে মানব পাচারকারী চক্রগুলো।
সবচেয়ে সক্রিয় অভিবাসনপথগুলোর চিত্র:
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথ:
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে এটি ছিল ইউরোপের সবচেয়ে ব্যস্ততম পথ। এ পথে ২৪ হাজার ২০০-এর বেশি পারাপার শনাক্ত হয়েছে (গত বছরের চেয়ে ২৫% কম)। পুরো সময়ের হিসাবে লিবিয়া থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপমুখী রুটটি সক্রিয় থাকলেও জুলাই থেকে তুরস্কের স্থলসীমান্ত হয়ে গ্রিসে প্রবেশের চাপ বাড়ে। এ পথে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া অভিবাসীদের তালিকায় রয়েছেন আফগান, সুদানি ও বাংলাদেশি নাগরিকরা।
মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ:
এ পথে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জনের অনুপ্রবেশ শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কম। লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের ফলে এ পথে নৌযাত্রা ব্যাপকভাবে কমেছে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ পথে শনাক্ত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাই ছিল সর্বাধিক। এরপরই রয়েছে সোমালি ও আলজেরীয় নাগরিকরা।
পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথ:
অন্যান্য পথে প্রবেশ কমলেও এ পথটিতে প্রবেশের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। আট মাসে এ পথে ১৫ হাজার ৯০০টি অবৈধ পারাপার শনাক্ত হয়েছে। আলজেরিয়া থেকে মূলত স্পেনের মূল ভূখণ্ড ও বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে পাড়ি জমানোর প্রবণতা দেখা গেছে।
পশ্চিম আফ্রিকান পথ ও ইংলিশ চ্যানেল:
মরিতানিয়া ও সেনেগালের কঠোর নজরদারির কারণে পশ্চিম আফ্রিকান পথে অনুপ্রবেশ ৫৮ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১০০টিতে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অবৈধ প্রচেষ্টা ৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৬০০টিতে।
kalprakash.com/IM