রক্তে একটি সহজ ‘মার্কার’ পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক সংক্রমণ বা সেপসিসে আক্রান্ত রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময়কাল প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। এই চিকিৎসাপদ্ধতিতে রক্তের ‘প্রোক্যালসিটোনিন’ পরীক্ষা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পরিচালিত এক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা দেওয়া রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্যম সময় ছিল ৪ দশমিক ৭ দিন; যেখানে প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিতে এই সময় লেগেছে ৯ দিন। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের মেয়াদ প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়েলকাম ট্রাস্ট এবং কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়। দেশি-বিদেশি ৫৭ জন বিশেষজ্ঞের গবেষক দলটির নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী। গত ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্রুপের ‘ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’-এ ‘প্রোক্যালবান’ (ProCal-Ban) শিরোনামে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা জানান, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে শরীরে নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর চেয়েও বড় বিপদ হলো, ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসা ব্যয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। সেপসিসের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও সময়সীমা কমিয়ে আনাই ছিল এ গবেষণার মূল লক্ষ্য।
গবেষণার বিষয়বস্তু ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রধান গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী জানান, ব্যাক্টেরিয়াজনিত গুরুতর সংক্রমণ হলে দেহে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করে। এই প্রাণঘাতী অবস্থাকেই বলা হয় সেপসিস। আমাদের দেশে দীর্ঘমেয়াদে রোগীদের উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। প্রোক্যালসিটোনিন মূলত রক্তে থাকা এমন একটি মার্কার, যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সংক্রমণ কমলে দ্রুত হ্রাস পায়। এই মাত্রা দেখেই চিকিৎসকেরা নিরাপদে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
গবেষণায় চমেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৩২ জন সেপসিস রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোগীদের দুটি পৃথক দলে ভাগ করে দেখা যায়, প্রোক্যালসিটোনিন নির্দেশিত পদ্ধতিতে অ্যান্টিবায়োটিকের সময়কাল অর্ধেকের বেশি কমলেও উভয় দলের রোগীদের সুস্থতার হার বা মৃত্যুঝুঁকিতে কোনো নেতিবাচক পার্থক্য দেখা যায়নি।
ডা. ফরহাদ উদ্দিন জানান, গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত খরচ কমিয়ে প্রতিবার প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার ব্যয় প্রায় ৪ ডলারে (প্রায় ৫০০ টাকা) নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জাতীয়ভাবে এ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতি ও অর্থনৈতিক বোঝা থেকে রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ কেবল আন্তর্জাতিক গবেষণার ক্ষেত্রই নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে কার্যকর আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল প্রমাণ উপস্থাপনেও সক্ষম।
kalprakash.com/IM