পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও শরীরজুড়ে সার্বক্ষণিক ক্লান্তি বা সামান্য পরিশ্রমেই শরীর ভেঙে পড়ার পেছনে একাধিক জটিল রোগের গভীর যোগসূত্র থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির পাঁচটি রোগের কারণে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দিলেও সেগুলোর নেপথ্যে কাজ করে মানবদেহের এক অভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া।
গবেষকেরা দীর্ঘ কোভিড (লং কোভিড), মায়ালজিক এনসেফালোমাইলাইটিস বা ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম (এমই/সিএফএস), পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস—এই পাঁচটি ভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ জৈবিক নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এ গবেষণার তথ্য জানিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বায়োডায়নামিকসের গবেষকেরা যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করেন।
পাঁচ রোগের ভিন্ন কারণ, কিন্তু অভিন্ন উপসর্গ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত রোগগুলোর প্রাথমিক কারণ ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। দীর্ঘ কোভিডের সূত্রপাত হয় ভাইরাস সংক্রমণের পর। পিটিএসডির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অতীতের গভীর মানসিক আঘাত। অন্যদিকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো রোগে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিকতার সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। তবে প্রাথমিক কারণ ভিন্ন হলেও সবগুলো রোগেই একটি অভিন্ন ও চরম দুর্বলকারী উপসর্গ হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী তীব্র ক্লান্তি দেখা দেয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, আলাদা আলাদা রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিনগুলো মানবদেহের একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে— ১. রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও শারীরিক প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ ২. কোষে শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া ৩. সামগ্রিক বিপাকীয় কার্যক্রম ৪. মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া ৫. স্নায়ু ও হরমোনের পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহের এসব অপরিহার্য ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে শরীরে তীব্র ও স্থায়ী ক্লান্তি তৈরি হয়।
জিন আলাদা, কিন্তু নেটওয়ার্ক এক গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পাঁচটি রোগের ক্ষেত্রে সরাসরি অভিন্ন জিনের উপস্থিতি খুব বেশি পাওয়া যায়নি। বরং জিনগুলো শরীরের ভেতরে কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, তা বিশ্লেষণ করেই এই মিল ধরা পড়েছে।
গবেষণায় অক্সফোর্ড বায়োডায়নামিকসের উদ্ভাবিত ‘এপিসুইচ ওরিয়ন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত কোষের ভেতরে ডিএনএর ত্রিমাত্রিক ভাঁজ এবং দূরবর্তী অংশগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। গবেষকদের ভাষ্য, কেবল ডিএনএর প্রাথমিক তথ্য দেখলে এ রোগগুলোর অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক বোঝা যায় না; কিন্তু জিনগুলোর জটিল নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করলেই গভীর যোগসূত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গবেষকদের ধারণা, প্রাথমিক সংক্রমণ বা মানসিক আঘাত ভিন্ন ভিন্ন হলেও তা শেষ পর্যন্ত শক্তি উৎপাদন ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার একই সাধারণ কেন্দ্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখা দেয় দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা ক্রনিক ফ্যাটিগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তবে এটি এখনও প্রাথমিক গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসার জন্য আরও বিশদ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
kalprakash.com/IM