পেটের চারপাশে অতিরিক্ত মেদ জমা, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করা কিংবা নিয়মিত মিষ্টি পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া—এসবকে অনেকেই কেবল ওজন বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, এসব অভ্যাসের কারণে শরীরে জমতে থাকা ক্ষতিকর চর্বি সরাসরি লিভারে প্রভাব ফেলে। এমনকি এর সঙ্গে মানবদেহের প্রয়োজনীয় হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং নারী ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার এই অবস্থাকে ‘ফ্যাটি লিভার’ বলা হয়। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার এবং কায়িক শ্রমের ঘাটতির কারণে এ সমস্যা দেখা দেয়। অ্যালকোহল বা মদ্যপান না করলেও এ রোগ হতে পারে, যাকে বলা হয় ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ (এনএএফএলডি)। বর্তমানে কেবল মধ্যবয়সী ব্যক্তিরাই নন, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও এই রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। প্রাথমিক অবস্থায় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ না থাকায় এটি রক্ত পরীক্ষা বা আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে আকস্মিকভাবে ধরা পড়ে।
ফ্যাটি লিভার হলে শরীরে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হয়? লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে শরীরে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ শরীর ইনসুলিনের প্রতি কার্যকরভাবে সাড়া না দেওয়ায় রক্তে শর্করার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, যা পরবর্তীতে স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস ডেকে আনে। ফ্যাটি লিভার দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। কালক্রমে তা লিভার ফাইব্রোসিস এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
সন্তান ধারণে কি প্রভাব ফেলতে পারে? লিভার শরীরের মেটাবলিজম ও হরমোনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। ভারতের বেঙ্গালুরুর বিরলা ফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফের বিশেষজ্ঞ ডা. মঞ্জুনাথ সি এসের মতে, ফ্যাটি লিভার থেকে তৈরি হওয়া ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স মানবদেহের প্রজনন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটায়।
নারীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের প্রভাবে অনিয়মিত পিরিয়ড ও ডিম্বস্ফোটনে (ওভুলেশন) জটিলতা দেখা দেয়। এর সঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমেরও (পিসিওএস) সরাসরি সংযোগ রয়েছে, যা সন্তান ধারণে বিলম্ব বা বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রেও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও মেটাবলিক সমস্যার কারণে টেস্টোস্টেরন হরমোনের ঘাটতি হতে পারে, যা শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান হ্রাস করে প্রজনন ক্ষমতা দুর্বল করে তোলে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভার থাকলেই যে সন্তান ধারণ করা অসম্ভব—এমনটি নয়; সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও পরামর্শ নিলে জটিলতা দূর করা সম্ভব।
যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন:
-
দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ও অকারণ ক্লান্তি
-
পেটের চারপাশে বাড়তি মেদ বৃদ্ধি
-
ডান পাঁজরের নিচে ভারী ভাব বা অস্বস্তি অনুভূতি
-
নারীদের ক্ষেত্রে হঠাৎ মাসিক অনিয়মিত হওয়া
-
পরিবারে ডায়াবেটিস বা ফ্যাটি লিভারের ইতিহাস থাকা
-
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই সন্তান ধারণে বিলম্ব ঘটা।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তনই মূল সমাধান: ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করা জরুরি। শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা, অতিরিক্ত চিনি ও কোমল পানীয় বর্জন এবং সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সময়মতো সচেতন হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য।
kalprakash.com/IM