বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে একটি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ মুহূর্তেই একজন মানুষকে বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রচারের সক্ষমতা এনে দেয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লব মানবকল্যাণে অসামান্য অবদান রাখলেও এর অপব্যবহার নতুন এক গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। অমূলক ধারণা, অন্যের গোপনীয়তা অনুসন্ধান, গুজব, অপপ্রচার, মিথ্যা অপবাদ, চরিত্রহনন, ভুয়া স্ক্রিনশট, ডিপফেক (Deepfake) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি বিকৃত ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রকেও বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের বিধানে এগুলো কেবল অনৈতিক কাজই নয়; বরং গুরুতর মহাপাপ, ফিতনা এবং ইহকাল ও পরকালে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
পবিত্র কোরআনে মানুষের চিন্তা ও তথ্য গ্রহণের নৈতিকতার ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বিরত থাক; নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ। তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং কেউ কারও গিবত করো না।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ১২)। এই একটি আয়াতেই ডিজিটাল যুগের বহুবিধ অপরাধের বাস্তব সমাধান বর্ণিত হয়েছে। কারণ ভিত্তিহীন অমূলক ধারণা থেকেই সন্দেহের জন্ম হয়। সেই সন্দেহ মানুষকে অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তা অনুসন্ধানে প্ররোচিত করে। আর সেখান থেকেই ডালপালা মেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, মিথ্যা অপবাদ ও চরিত্রহননের মতো অপরাধ।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি ছবি, ভিডিও বা বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট যাচাই না করেই মন্তব্য করা এবং অন্যকে দোষারোপ করার প্রবণতা বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও চেহারা বা কণ্ঠস্বর বিকৃত করে অসত্য বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া আজ বাস্তব সংকটে রূপ নিয়েছে। একইভাবে ভুয়া স্ক্রিনশট, সম্পাদিত ছবি বা প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন অডিও-ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ করা হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব সুস্পষ্ট প্রতারণা, মিথ্যা সাক্ষ্য এবং গুরুতর অপবাদের শামিল।
তথ্য যাচাইয়ের অপরিহার্যতা তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও; অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা আল-হুজুরাত : ৬)। আধুনিক পরিভাষায় ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ বা তথ্য যাচাইয়ের অন্যতম মৌলিক নীতি এই আয়াতে নিহিত। কোনো তথ্য সত্যতা নিশ্চিত না করে প্রচার বা বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য জায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই প্রচার করে।’ (সহিহ মুসলিম)। বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি অবিবেচক ‘শেয়ার’, ‘ফরোয়ার্ড’ বা ‘রিপোস্ট’ মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়, যার দায় থেকে প্রচারকারী কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারেন না।
ডিজিটাল অপপ্রচারের আরেকটি ভয়ংকর রূপ হলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহনন। আলেম, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালিয়ে সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের প্রতি এমন অপরাধের অপবাদ দেয় যা তারা করেনি, তারা ভয়ংকর অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আল-আহযাব : ৫৮)। সুরা আন-নুরে বর্ণিত ঐতিহাসিক ‘ইফক’-এর ঘটনা শিক্ষা দেয় যে, একটি ভিত্তিহীন অপপ্রচার পুরো সমাজকে কতটা অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে কেবল ভিউ, রিচ বা ট্রেন্ড তৈরির উদ্দেশ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ভুয়া আইডি থেকে অপপ্রচার চালানো আধুনিক ডিজিটাল ফিতনা। প্রযুক্তি মূলত একটি মাধ্যম; এর সঠিক বা অপব্যবহারই একে কল্যাণ অথবা অকল্যাণে রূপ দেয়। মানবীয় আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও চূড়ান্ত বিচারের দিনে আল্লাহর কাঠগড়ায় প্রতিটি ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতেই হবে। তাই প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে অন্তরে খোদাভীতি ও নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত রাখা জরুরি। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত সত্যনিষ্ঠা ও যাচাইয়ের সংস্কৃতি গ্রহণ করলেই প্রযুক্তির এই অভিশাপ থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
kalprakash.com/IM