হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। স্বয়ং মহান আল্লাহ তাঁকে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ বা জগৎসমূহের জন্য রহমত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন আশীর্বাদ। ক্ষমা, দয়া, ধৈর্য, সহনশীলতা ও অতুলনীয় মহানুভবতা ছিল শেষ পয়গম্বরের চরিত্রের অন্যতম প্রধান ভূষণ। তাঁর অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাইকে মুগ্ধ করত।
মহানবী (সা.) এমন এক সময় ধরাধামে আগমন করেন, যখন সমগ্র সমাজ অসত্য, অবিচার ও জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তিনি ঘোর অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে মানবতার মুক্তির দিশারি হিসেবে আবির্ভূত হন। ঐতিহাসিক মুরের ভাষায়, ‘মুহাম্মদ যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁকে শুধু সে যুগের একজন মনীষী বলা যাবে না; বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।’ শুধু মুর নন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু ভিন্নধর্মাবলম্বী গবেষক ও গুণীজন রাসুল (সা.)-এর মহত্ত্বের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন।
কৈশোর থেকেই তিনি সততা ও আমানতদারির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সংযম ও পরোপকারের কারণে মক্কার পৌত্তলিক সমাজেও তিনি ‘আল-আমিন’ বা পরম বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত হন। ইসলাম প্রচারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আত্মত্যাগ ছিল তুলনাহীন। রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও গোত্রীয় দ্বন্দ্বে লিপ্ত আরব জাতিকে তিনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সন্ধি ও চুক্তি সম্পাদনের ভূমিকা ইতিহাসে অনন্য। একান্ত বাধ্য না হলে যুদ্ধে না জড়ানো এবং আক্রান্ত হলেও শত্রুপক্ষের নারী, শিশু ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আঘাত না করার যে নীতি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আধুনিক যুগেও যুদ্ধনীতির সেরা উদাহরণ।
মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র হওয়া সত্ত্বেও সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাঁকে চরম নির্যাতন ভোগ করতে হয়। নিজের ও অনুসারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন। এরপরও মক্কার মুশরিকদের আক্রমণ বন্ধ হয়নি। তবে সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত মহানবীর (সা.) নেতৃত্বে মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন। রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের দিনে পরম শত্রুদের প্রতি তাঁর প্রদর্শিত সাধারণ ক্ষমা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক স্টেনলি লেনপুল লিখেছেন, ‘যে নগরীতে দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি ছিলেন অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার এবং যেখান থেকে তিনি নির্মমভাবে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সেই শহরে বিজয়ীর বেশে প্রবেশের মুহূর্তে তাঁর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ছিল যেমন চমকপ্রদ, তেমনি অকল্পনীয়।’
বিখ্যাত চিন্তাবিদ জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর ‘দ্য জেনুইন ইসলাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, পরিবর্তনশীল দুনিয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আশ্চর্য জীবনীশক্তি রয়েছে ইসলামের। তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে মানবজাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করে উল্লেখ করেন, তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্ব যদি বর্তমান বিশ্বের নেতৃত্বে থাকতেন, তবে পৃথিবীর যাবতীয় সংকটের এমন সমাধান মিলত, যা শান্তি ও সুখ এনে দিত। একইভাবে ১৮৪০ সালে এডিনবার্গের এক সভায় মহামতি টমাস কার্লাইল ঘোষণা করেছিলেন, মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব ও দূতের আসনে সর্বোচ্চ মর্যাদার স্থান অধিকার করে আছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
kalprakash.com/IM