ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের নামে রয়েছে প্রায় ৩৮৫ দশমিক ৭৮ একর জমি। বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে মসজিদটি। মসজিদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের নামে অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি মহলের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মসজিদের বিপুল সম্পত্তি বেহাত কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মসজিদের নামে থাকা বিপুল সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, সংরক্ষণ ও ইজারা দেওয়া হলে সেই আয় থেকেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার এবং মুসল্লিদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। বছরের পর বছর ধরে শত শত একর জমি থাকলেও মসজিদের অবকাঠামোর কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি; বরং দিন দিন মসজিদটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ছে। এ নিয়ে মসজিদের সম্পদ, আয়-ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
মসজিদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের তীর বর্তমান মোতাওয়াল্লি ইউসুফ আলীর দিকে। তাঁদের দাবি, মসজিদের বিপুল সম্পত্তি থেকে কত টাকা আয় হচ্ছে এবং সেই অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে—তার কোনো সুস্পষ্ট ও উন্মুক্ত হিসাব মুসল্লিদের সামনে প্রকাশ করা হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাজী ঢাকনা মুহাম্মদ সরকার কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের নামে এই বিপুল পরিমাণ জমি দান করেছিলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ১৯৫৪ সালে মসজিদের সম্পত্তির কিছু ওয়ারিশ কাদিরহাট এলাকা থেকে নেকমরদ এলাকায় চলে যান। পরবর্তীতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৩২৭ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে সম্পত্তি বিভাজন ও ভোগদখল সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার সম্পদ নির্ধারিত ওয়ারিশদের ভোগদখলে থাকার কথা থাকলেও কাদিরহাটের কিছু লোক নেকমরদ এলাকায় এসে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও জমি দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে মসজিদের সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে বিরোধ ও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মসজিদ পরিচালনা সংক্রান্ত ২০২৩ সালের ৩৯ নম্বর রেজুলেশন নিয়েও গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে। ওই রেজুলেশনে মাত্র ২৩ শতাংশ জমি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আপ্যায়নে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মামলা পরিচালনা, ভূমি অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন খাতে আরও প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নথিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও মসজিদের নামে থাকা জমির সরকারি খাজনা বাবদ প্রায় অর্ধকোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—মসজিদের সম্পত্তি থেকে নিয়মিত আয় থাকলে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কেন সরকারি খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে না?
স্থানীয় মুসল্লিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মসজিদের নামে শত শত একর জমি থাকার পরও তা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁরা মসজিদের নামে থাকা ৩৮৫ দশমিক ৭৮ একর জমির বর্তমান মালিকানা ও দখল পরিস্থিতি, খাজনা, ইজারা এবং গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে মসজিদের সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো এবং অভিযোগ তদন্তে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত মোতাওয়াল্লি ইউসুফ আলীর মুঠোফোনে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
kalprakash.com/IM