আরবি ও উর্দু ভাষায় ‘ফাল’ বা ‘নেক ফাল’ শব্দটি অশুভ লক্ষণ বা কুসংস্কারের সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো ঘটনা বা কথাকে শুভ মনে করে তার মাধ্যমে ভালো পরিণতির প্রত্যাশা করাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘ফাল’ বা ‘নেক ফাল’ বলা হয়।
উদাহরণস্বরূপ—কোনো অসুস্থ ব্যক্তি যদি কারও মুখে ‘সালিম’ (নিরাপদ বা সুস্থ) শব্দটি শোনে, অথবা হারানো জিনিস খোঁজার সময় কেউ যদি ‘ওয়াজিদ’ (যে খুঁজে পায়) শব্দ শুনতে পায়, তখন সেটিকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে গ্রহণ করে সুস্থতা বা জিনিসটি ফিরে পাওয়ার আশা করা।
ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ইতিবাচকতা এবং আশাবাদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। এটি হতাশা ও নেতিবাচক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই করে মানুষকে মানসিক শক্তি জোগায়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইতিবাচক মনোভাব এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণের বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহর প্রতি আস্থার নিদর্শন আশাবাদ
বিপদের সময় অস্থিরতা ও হতাশায় ভেঙে পড়া মানুষের অন্যতম প্রধান মানসিক দুর্বলতা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পাশ কাটিয়ে চলে যায়; আর যখন তাকে কোনো অকল্যাণ স্পর্শ করে, তখন সে হয়ে যায় চরম হতাশ।’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ৮৩)।
পক্ষান্তরে আশাবাদী মুমিন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং তিনি বান্দার জন্য কল্যাণই চান। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার সঙ্গে তেমনই আচরণ করি এবং সে যখন আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪০৫)। আল্লাহর প্রতি এমন গভীর আস্থাই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষকে নির্ভীক ও অটল রাখে, যেমনটি ইবরাহিম (আ.) ও হুদ (আ.)-এর মতো নবীদের জীবনে দেখা গেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে আশাবাদের শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুরো জীবনই ছিল আশাবাদ ও সুপ্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। তিনি আল্লাহ সম্পর্কে সর্বদা উত্তম ধারণা পোষণ করতেন এবং সুন্দর ও ইতিবাচক অর্থবোধক কথা শুনতে পছন্দ করতেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো প্রয়োজনে বের হতেন, তখন ‘হে রাশিদ!’ (সঠিক পথপ্রাপ্ত) অথবা ‘হে নাজিহ!’ (সফল ব্যক্তি)—এমন অর্থপূর্ণ কথা শুনতে ভালোবাসতেন। (তিরমিজি, হাদিস : ১৬১৬)।
হুদাইবিয়ার সন্ধির সংকটময় মুহূর্তে কুরাইশদের প্রতিনিধি হিসেবে ‘সুহাইল’ নামের এক ব্যক্তি এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশাবাদী হয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের ব্যাপারটি সহজ হয়ে গেল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৩১); কারণ ‘সুহাইল’ শব্দের অর্থ সহজতা। এ ছাড়া বৃষ্টির জন্য দোয়ার সময় তিনি চাদর উল্টে দিয়ে প্রতীকীভাবে সংকট দূর হয়ে স্বস্তি ও উর্বরতা আসার সুপ্রত্যাশা প্রকাশ করতেন।
উদ্যম ও ইবাদতে ইতিবাচকতার প্রভাব
আশাবাদ মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে এবং কর্মচাঞ্চল্য ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অহেতুক ভীতি বা নেতিবাচক চিন্তা মানুষকে কাজ ও ইবাদতে স্থবির করে ফেলে। আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার প্রতি দৃঢ় আশাই বান্দাকে নিষ্ঠার সঙ্গে সর্বোত্তমভাবে ইবাদত করতে উৎসাহিত করে। এজন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষণ্ণতা ও অলসতা থেকে নিয়মিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
kalprakash.com/IM