শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬ | ৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৭ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ১:১২:৪৯

অমুসলিমের রান্না করা খাবার ও দাওয়াত গ্রহণের শরয়ি বিধান কী

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৫
শেয়ার: mail
অমুসলিমের রান্না করা খাবার ও দাওয়াত গ্রহণের শরয়ি বিধান কী

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

একে অপরের সঙ্গে বসবাস, কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়েই মানুষের সমাজজীবন পরিচালিত হয়। বর্তমান সময়ে মুসলমানদের কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মেলামেশা করতে হয়। কখনো অমুসলিম সহকর্মী দাওয়াত দেন, কখনো ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তাঁদের বাসায় যেতে হয়, আবার কখনো অমুসলিমদের পরিচালিত হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে হয়।

এ অবস্থায় অনেক মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, অমুসলিমের বাড়িতে বা হোটেলে রান্না করা খাবার খাওয়ার শরয়ি বিধান কী?

অমুসলিমের হাতে তৈরি হালাল খাবার

ভাত, ডাল, সবজি, রুটি, ফলমূল, মিষ্টি, হালুয়া ইত্যাদি খাবার, যেগুলো মূলত হালাল এবং যার মধ্যে কোনো হারাম বা অপবিত্র উপাদান মেশানো হয়নি, সেগুলো অমুসলিম ব্যক্তি প্রস্তুত করলেও মুসলমানের জন্য খাওয়া জায়েজ। ইসলাম এ ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দিয়েছে। খাবারটি কে প্রস্তুত করেছে কেবল সেটিই মুখ্য নয়; বরং খাবারের উপাদান হালাল কি না, তা পবিত্র কি না এবং মাংস হলে তা শরিয়তসম্মতভাবে জবাই করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১৮/১৬৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৪০১)

অতএব, কোনো হিন্দু বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশী যদি দাওয়াত দেন এবং সেখানে ফলমূল, ভাত, ডাল, মাছ, সবজি, রুটি কিংবা অন্যান্য হালাল খাবার পরিবেশন করেন, তবে কেবল তিনি অমুসলিম হওয়ার কারণে সেই খাবার হারাম হয়ে যাবে না। তবে খাবারে যদি কোনো হারাম বা অপবিত্র বস্তু মেশানো হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তবে তা খাওয়া যাবে না। যেমন কোনো খাবারে নাপাক বস্তু বা শরিয়তে নিষিদ্ধ কোনো উপাদান মেশানো হয়েছে এবং বিষয়টি নিশ্চিত, তাহলে মুসলমানদের জন্য সেই খাবার পরিহার করা আবশ্যক।

মাংসের ক্ষেত্রে সতর্কতা

সাধারণ খাবার ও মাংসজাত খাবারের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ভাত, ডাল, সবজি বা রুটির ক্ষেত্রে জবাইয়ের প্রশ্ন নেই। কিন্তু গরু, ছাগল, মুরগি, হাঁসের মতো হালাল প্রাণীর মাংস খাওয়ার জন্য শরিয়তের নির্ধারিত বিধান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে, তোমরা তা থেকে আহার করো, যদি তোমরা তাঁর আয়াতসমূহে বিশ্বাসী হও। (সুরা আল-আনআম: ১১৮)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তোমরা তা থেকে আহার কোরো না। নিশ্চয়ই তা অবাধ্যতা। (সুরা আল-আনআম: ১২১)

অন্য আয়াতে এসেছে, তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শুকরের মাংস এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। (সুরা আল-মায়িদা: ৩)

তাই অমুসলিমের বাসা বা হোটেলে মাংস পরিবেশন করা হলে তার উৎস সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং খোঁজখবর নেওয়া উচিত। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রাণীটি হালাল এবং মুসলমান ব্যক্তি দ্বারা শরয়ি পদ্ধতিতে জবাই করা হয়েছে, তাহলে তা খাওয়া যাবে। আর যদি জানা যায় যে প্রাণীটি এমন ব্যক্তির জবাই করা, যার জবাই শরিয়তসম্মত নয়, তবে তা খাওয়া যাবে না। কোনো বাসার বা হোটেলের মাংসের উৎস সম্পর্কে যদি যুক্তিসঙ্গত ও জোরালো সন্দেহ থাকে, তবে তা পরিহার করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। আর এ দুটির মাঝখানে রয়েছে কিছু সন্দেহজনক বিষয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)

তবে নিছক কল্পনা, অমূলক আশঙ্কা কিংবা প্রমাণ ছাড়া সন্দেহের বশবর্তী হয়ে হালাল খাবারকে হারাম বলাও শরিয়তসম্মত নয়।

অমুসলিমের দাওয়াত গ্রহণ

অমুসলিমের সঙ্গে সামাজিক সৌজন্য ও সদাচরণ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং শান্তিপূর্ণ অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম আচরণের অনুমতি কোরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা দ্বিনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। (সুরা আল-মুমতাহিনা: ৮)

সুতরাং প্রতিবেশী, সহকর্মী, ব্যবসায়িক অংশীদার কিংবা সামাজিক পরিচিতজন হিসেবে কোনো অমুসলিম যদি দাওয়াত দেন, সেখানে হালাল খাবার পরিবেশন করা হলে তা গ্রহণ করা মূলত বৈধ। ইসলামের ইতিহাসেও অমুসলিমদের সঙ্গে বৈধ সামাজিক সম্পর্কের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। নবীজি (সা.) অমুসলিমদের সঙ্গে লেনদেন করেছেন, সামাজিক সম্পর্ক রেখেছেন এবং উপহার গ্রহণ করেছেন। ফলে অমুসলিমের হাতের সব খাবারকে এককথায় হারাম বলা ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

তবে অমুসলিমের সাধারণ দাওয়াত গ্রহণ এবং তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কাজ, ব্যবসা, শিক্ষা বা প্রতিবেশীসুলভ সামাজিক প্রয়োজনে তাদের বাসায় যাওয়া এবং হালাল খাবার খাওয়া বৈধ হলেও তাদের ধর্মীয় পূজা-অর্চনা, উপাসনা বা আনুষ্ঠানিকতায় শরিক হওয়া জায়েজ নয়।

মুসলমান তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করবে, বিপদে পাশে দাঁড়াবে এবং ন্যায়বিচার করবে; কিন্তু নিজের ঈমান, আকিদা-বিশ্বাস ও ইসলামী স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখবে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

অমুসলিমের রান্না করা খাবার ও দাওয়াত গ্রহণের শরয়ি বিধান কী

বিস্তারিত কমেন্টে