রাজকীয় দায়িত্ব ছাড়ার ছয় বছর পর দীর্ঘ সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল। তাঁদের দুই সন্তান প্রিন্স আর্চি ও প্রিন্সেস লিলিবেট আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের স্কুলে ভর্তি হবে বলে জানা গেছে। তবে তাঁদের ফেরার ঘোষণার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি নিরাপত্তা ইস্যু।
হ্যারি ও মেগান লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িতে বসবাস করবেন। এটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাসভবন নয়।
২০২০ সালে রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর হ্যারির সরকারি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পুরো ব্যয় তাঁরা নিজেরাই বহন করে আসছেন।
দীর্ঘ সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পরিকল্পনার কারণে এখন তাঁদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করবে রয়্যাল অ্যান্ড ভিআইপি এক্সিকিউটিভ কমিটি (র্যাভেক)। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই স্বাধীন কমিটিই মূলত রাজপরিবারের সদস্য ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার স্তর নির্ধারণ করে থাকে।
এর আগে র্যাভেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, হ্যারি যুক্তরাজ্যে নিয়মিত বসবাস না করায় প্রতিবার দেশে ফেরার সময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাময়িক নিরাপত্তা নির্ধারণ করা হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের কারণে সেই নীতিমালায় পরিবর্তন আসতে পারে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম হ্যারি-মেগানের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, রাজপরিবারের নিরাপত্তা নির্ধারণ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঝুঁকি ও প্রয়োজন মূল্যায়ন করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে নিরাপত্তার সংবেদনশীল বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে না।
হ্যারি ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে। সরকারি নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হ্যারি আদালতে আইনি লড়াই চালালেও গত বছর সেই মামলায় পরাজিত হন।
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর তাঁরা আগের চেয়ে উন্নত সরকারি নিরাপত্তা পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাজকীয় দায়িত্বে ফেরার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় নিয়মিত দায়িত্ব পালনকারী রাজপরিবারের সদস্যদের মতো সর্বোচ্চ প্রটোকল হয়তো তাঁরা পাবেন না। এছাড়া আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে হ্যারির দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিরাপত্তা মূল্যায়নে গুরুত্ব পেতে পারে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে তার ব্যয় তাঁদের নিজেদেরই মেটাতে হতে পারে।
হ্যারি-মেগানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মতে, যুক্তরাজ্যে ফেরার মতো অনুকূল পরিস্থিতি এখন তৈরি হয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িটি তাঁরা বিক্রি করছেন না এবং সেখানকার ব্যবসা ও অন্যান্য কাজও চলমান থাকবে।
এদিকে রাজপরিবারের সঙ্গেও তাঁদের দূরত্ব কমে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত জুলাইয়ে হ্যারি, মেগান ও তাঁদের সন্তানরা গ্লুস্টারশায়ারে রাজা তৃতীয় চার্লসের হাইগ্রোভ বাসভবনে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় পর সেটিই ছিল রাজা চার্লসের সঙ্গে তাঁর নাতি-নাতনিদের প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
রাজপরিবার বিষয়ক বিশ্লেষক ও লেখক ভ্যালেন্টাইন লোর মতে, পরিবারের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি মিটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইচ্ছাও হ্যারির যুক্তরাজ্যে প্রত্যাবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে।
তাছাড়া আগামী বছর ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে হ্যারির প্রতিষ্ঠিত ইনভিক্টাস গেমস। অসুস্থ, আহত ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সাবেক ও বর্তমান সেনাসদস্যদের এই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের সমন্বয় কার্যক্রমে হ্যারিকে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হবে। পাশাপাশি আগামী বছর তাঁর মা প্রিন্সেস ডায়ানার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি।
সব মিলিয়ে হ্যারি-মেগানের যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাবর্তন শুধু তাঁদের পারিবারিক জীবনের জন্যই নয়, বরং নিরাপত্তা বিতর্ক নিরসন এবং রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
kalprakash.com/IM