বাংলাদেশ ০৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনামঃ
Logo ‘ফার্মের মুরগী’ বিতর্কে আত্মপ্রকাশ করল ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ Logo মঠবাড়িয়ার আবাসিক হোটেলে অভিযান, মাদকদ্রব্যসহ আটক ২ Logo যাত্রীসংকটে ১৬ জুলাই থেকে যশোর-ঢাকা রুটে ফ্লাইট বন্ধ করছে ইউএস-বাংলা Logo সুন্দরবনের বনদস্যু ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধানসহ ২৭ জনের আত্মসমর্পণ Logo সাঁথিয়ায় সাংবাদিক আব্দুদ দাইন সরকারকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ Logo রুহিয়ায় চুরি হওয়া ষাঁড় গরু উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১ Logo নওগাঁয় জমি নিয়ে বিরোধে হামলার অভিযোগ, নারীসহ আহত ৪ Logo গঙ্গাচড়ায় বসুন্ধরা শুভসংঘের শিক্ষা উপকরণ পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা Logo এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান Logo আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম

জমে উঠেছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘিওরের নৌকার হাট

মানিকগঞ্জের ঘিওরে জমে উঠেছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমে মুখর হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই নৌকার হাট। নৌকাশিল্পের জন্য খ্যাত ঘিওরের কারিগরদের তৈরি নৌকা জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মিস্ত্রিপাড়ার নারী-পুরুষ। তাদের যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই।

পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ইছামতি ও ধলেশ্বরীসহ কয়েকটি নদীবেষ্টিত জেলা মানিকগঞ্জ। ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা নিম্নাঞ্চল হওয়ায় নদ-নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পানি প্রবেশ শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব অঞ্চলের মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা নৌকা। জেলার চারটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘিওরের নৌকার হাটে ভিড় করছেন। সাধ্য অনুযায়ী নৌকা কেনার চেষ্টা করছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে মানিকগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের প্রধান বাহন নৌকা। মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় বর্ষায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে বাড়িঘরেও পানি ওঠে। ফলে নৌকা ছাড়া চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণে বর্ষা শুরুর আগেই এসব এলাকার মানুষ নৌকা কিনতে ঘিওরের হাটে আসেন। নৌকা তৈরিতে মেহগনি, কড়ই, আম, চাম্বল ও রেইনট্রি কাঠ বেশি ব্যবহার করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ জামে মসজিদ মাঠে বসা নৌকার হাটে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হাজারো নৌকা। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন আকার ও দামের নৌকা বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম খান বলেন, এত বড় নৌকার হাট আমি কোথাও দেখিনি। এই হাট জেলা ও উপজেলার ঐতিহ্যের অংশ। তিন পুরুষ ধরে এই হাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা শুনে আসছি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই হাটের সুনাম রয়েছে।

ঘিওর বাজারের কাঠমিস্ত্রি তপন সূত্রধর, কমল সূত্রধর, মামুন ও হাবিব জানান, বর্ষা মৌসুমে তারা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। প্রতি সপ্তাহে তাদের কারখানা থেকে প্রায় ২৫টি নৌকা হাটে আসে। বর্তমানে কাঠ, লোহা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। নৌকার আকার ও ধরনভেদে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে।

কাঠমিস্ত্রি দিলিপ দাস জানান, দাদার আমল থেকেই তিনি নৌকা তৈরির কাজ দেখে আসছেন। বর্ষা এলেই মিস্ত্রিপাড়ায় ব্যস্ততা বেড়ে যায়। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে নৌকা তৈরি শুরু হয়ে ভাদ্র মাস পর্যন্ত চলে। বর্তমানে ছোট ডিঙি ও কোষা নৌকার চাহিদা বেশি। কড়ই, চাম্বল, আম ও কদম কাঠের নৌকা বেশি বিক্রি হয়। তবে সরকারি সহায়তার অভাবে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।

ঘিওরের বানিয়াজুড়ি, বালিয়াডাঙ্গা, সিংজুড়ি, বেগুন নারচি এবং দৌলতপুর উপজেলার জিয়নপুর, বাঁচামারা, বাঘুটিয়া, চরকাটারি, খলসি, ধামশ্বর, কলিয়া ও বিনোদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা এবং শিবালয়ের কয়েকটি গ্রামের মানুষ বর্ষার প্রস্তুতিতে নৌকার হাটে ভিড় করছেন। প্রতি বুধবার হাটের দিন হওয়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে নৌকা সাজিয়ে বিক্রি করা হয়। তবে সপ্তাহজুড়েই চলে নৌকা বিক্রি।

নৌকা বিক্রেতা রুহিদাস সূত্রধর জানান, ১০ হাত লম্বা ও আড়াই হাত চওড়া একটি নৌকার দাম ৫ হাজার টাকা। ১১/৩ সাইজের নৌকা ৬ হাজার, ১৩/৩ সাইজের ৭ হাজার এবং ১৫/৩ সাইজের নৌকা ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের স্টিলের নৌকাও বিক্রি করেন তিনি। এসব নৌকার দাম তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘদিন টেকসই থাকে।

সিংজুড়ি এলাকা থেকে নৌকা কিনতে আসা লাল মিয়া বলেন, প্রতি বছর বর্ষায় একটি করে নৌকা কিনতে হয়। এ বছর দাম কিছুটা বেশি হলেও স্থানীয়ভাবে তৈরি নৌকা কিনতে পেরে তিনি সন্তুষ্ট।

উপজেলার বানিয়াজুড়ি ইউনিয়নের রাথুরা গ্রামের মো. জব্বার জানান, বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরে সংসার চালান তিনি। তাই সাড়ে ৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি নৌকা কিনেছেন।

kalprakash.com/IM

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ফার্মের মুরগী’ বিতর্কে আত্মপ্রকাশ করল ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’

জমে উঠেছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘিওরের নৌকার হাট

প্রকাশিত: ১২:০০:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

মানিকগঞ্জের ঘিওরে জমে উঠেছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমে মুখর হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই নৌকার হাট। নৌকাশিল্পের জন্য খ্যাত ঘিওরের কারিগরদের তৈরি নৌকা জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মিস্ত্রিপাড়ার নারী-পুরুষ। তাদের যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই।

পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ইছামতি ও ধলেশ্বরীসহ কয়েকটি নদীবেষ্টিত জেলা মানিকগঞ্জ। ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা নিম্নাঞ্চল হওয়ায় নদ-নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পানি প্রবেশ শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব অঞ্চলের মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা নৌকা। জেলার চারটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘিওরের নৌকার হাটে ভিড় করছেন। সাধ্য অনুযায়ী নৌকা কেনার চেষ্টা করছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে মানিকগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের প্রধান বাহন নৌকা। মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় বর্ষায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে বাড়িঘরেও পানি ওঠে। ফলে নৌকা ছাড়া চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণে বর্ষা শুরুর আগেই এসব এলাকার মানুষ নৌকা কিনতে ঘিওরের হাটে আসেন। নৌকা তৈরিতে মেহগনি, কড়ই, আম, চাম্বল ও রেইনট্রি কাঠ বেশি ব্যবহার করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ জামে মসজিদ মাঠে বসা নৌকার হাটে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হাজারো নৌকা। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন আকার ও দামের নৌকা বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম খান বলেন, এত বড় নৌকার হাট আমি কোথাও দেখিনি। এই হাট জেলা ও উপজেলার ঐতিহ্যের অংশ। তিন পুরুষ ধরে এই হাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা শুনে আসছি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই হাটের সুনাম রয়েছে।

ঘিওর বাজারের কাঠমিস্ত্রি তপন সূত্রধর, কমল সূত্রধর, মামুন ও হাবিব জানান, বর্ষা মৌসুমে তারা নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। প্রতি সপ্তাহে তাদের কারখানা থেকে প্রায় ২৫টি নৌকা হাটে আসে। বর্তমানে কাঠ, লোহা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। নৌকার আকার ও ধরনভেদে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে।

কাঠমিস্ত্রি দিলিপ দাস জানান, দাদার আমল থেকেই তিনি নৌকা তৈরির কাজ দেখে আসছেন। বর্ষা এলেই মিস্ত্রিপাড়ায় ব্যস্ততা বেড়ে যায়। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে নৌকা তৈরি শুরু হয়ে ভাদ্র মাস পর্যন্ত চলে। বর্তমানে ছোট ডিঙি ও কোষা নৌকার চাহিদা বেশি। কড়ই, চাম্বল, আম ও কদম কাঠের নৌকা বেশি বিক্রি হয়। তবে সরকারি সহায়তার অভাবে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।

ঘিওরের বানিয়াজুড়ি, বালিয়াডাঙ্গা, সিংজুড়ি, বেগুন নারচি এবং দৌলতপুর উপজেলার জিয়নপুর, বাঁচামারা, বাঘুটিয়া, চরকাটারি, খলসি, ধামশ্বর, কলিয়া ও বিনোদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা এবং শিবালয়ের কয়েকটি গ্রামের মানুষ বর্ষার প্রস্তুতিতে নৌকার হাটে ভিড় করছেন। প্রতি বুধবার হাটের দিন হওয়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে নৌকা সাজিয়ে বিক্রি করা হয়। তবে সপ্তাহজুড়েই চলে নৌকা বিক্রি।

নৌকা বিক্রেতা রুহিদাস সূত্রধর জানান, ১০ হাত লম্বা ও আড়াই হাত চওড়া একটি নৌকার দাম ৫ হাজার টাকা। ১১/৩ সাইজের নৌকা ৬ হাজার, ১৩/৩ সাইজের ৭ হাজার এবং ১৫/৩ সাইজের নৌকা ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের স্টিলের নৌকাও বিক্রি করেন তিনি। এসব নৌকার দাম তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘদিন টেকসই থাকে।

সিংজুড়ি এলাকা থেকে নৌকা কিনতে আসা লাল মিয়া বলেন, প্রতি বছর বর্ষায় একটি করে নৌকা কিনতে হয়। এ বছর দাম কিছুটা বেশি হলেও স্থানীয়ভাবে তৈরি নৌকা কিনতে পেরে তিনি সন্তুষ্ট।

উপজেলার বানিয়াজুড়ি ইউনিয়নের রাথুরা গ্রামের মো. জব্বার জানান, বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরে সংসার চালান তিনি। তাই সাড়ে ৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি নৌকা কিনেছেন।

kalprakash.com/IM