অনেকের ধারণা, কাজী অফিসে গিয়ে কাবিননামায় স্বাক্ষর করলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কাবিননামায় সই করার পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবনযাপন বৈধ হয়ে যায়। তবে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
ইসলামি আইনবিদদের মতে, কাবিননামা মূলত বিয়ের একটি সরকারি নিবন্ধনপত্র বা প্রমাণপত্র। এটি বিয়ের আইনি স্বীকৃতি ও তথ্য সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিয়ের মূল আকদ (চুক্তি) নয়।
বিয়ে বৈধ হওয়ার শর্ত কী?
শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে সহিহ বা বৈধ হওয়ার জন্য পাত্র-পাত্রীর পক্ষ থেকে, অথবা তাদের বৈধ প্রতিনিধির মাধ্যমে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইজাব (বিয়ের প্রস্তাব) ও কবুল (প্রস্তাব গ্রহণ) সম্পন্ন হতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু কাগজে স্বাক্ষর করাই যথেষ্ট নয়; সাক্ষীদের সামনে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণের ঘোষণা দিতে হবে।
সাক্ষীর ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন
ইসলামি বিধান অনুযায়ী বিয়ের সময়—
- দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে; অথবা
- একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ ও দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী সাক্ষী থাকতে হবে।
সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমেই বিয়ের আকদ সম্পন্ন হয় এবং তখনই বিয়ে শরিয়তসম্মতভাবে কার্যকর হয়।
কাবিননামার গুরুত্ব
কাবিননামা স্বামী-স্ত্রীর অধিকার, দেনমোহর, বৈবাহিক সম্পর্কের প্রমাণ এবং ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর করলেই বিয়ে সম্পন্ন হয় না।
কোরআনে বিয়েকে বলা হয়েছে দৃঢ় অঙ্গীকার
মহান আল্লাহ বলেন—
وَأَخَذْنَ مِنْكُمْ مِيثَاقًا غَلِيظًا
উচ্চারণ: ওয়া আখাযনা মিনকুম মীছাকান গালীযা।
অর্থ: “আর তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।”
(সুরা আন-নিসা, আয়াত: ২১)
এই আয়াতে বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাদিসে যা বলা হয়েছে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا نِكَاحَ إِلَّا بِشَاهِدَيْ عَدْلٍ
উচ্চারণ: লা নিকাহা ইল্লা বি শাহিদাই আদলিন।
অর্থ: “দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ নয়।”
(বায়হাকি, দারাকুতনি)
আরেক হাদিসে এসেছে—
أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ
উচ্চারণ: আ’লিনু হাযান নিকাহ।
অর্থ: “তোমরা এ বিবাহ প্রকাশ্যভাবে সম্পন্ন করো।”
(জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৯)
শুধু সই করে সংসার শুরু করলে কী হবে?
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে যদি সাক্ষীদের উপস্থিতিতে যথাযথ ইজাব-কবুল সম্পন্ন না হয়, তাহলে শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হবে না। সে ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবনযাপনও বৈধ হবে না।
ধর্মীয় আলেমদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে তাওবা করে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে বিয়ের আকদ সম্পন্ন করা উচিত।
নতুন করে বিয়ে করতে যা করতে হবে
বৈধভাবে সংসার শুরু করতে চাইলে—
১. দেনমোহর নির্ধারণ করতে হবে।
২. প্রয়োজনীয় সাক্ষী উপস্থিত রাখতে হবে।
৩. পাত্র-পাত্রীর পক্ষ থেকে মৌখিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন করতে হবে।
এসব শর্ত পূরণ করে আকদ সম্পন্ন হলেই বিয়ে বৈধ হয়ে যাবে।
সারকথা, কাবিননামা বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র হলেও এটি নিজে বিয়ে সম্পন্ন করে না। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইজাব-কবুলই বিয়ের মূল ভিত্তি। তাই শুধু কাবিননামায় সই করলেই বিয়ে হয়ে গেছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
কাল প্রকাশ ডেস্ক 






















