লালমাটির শান্ত ক্যাম্পাস, চারপাশজুড়ে সবুজ পাহাড় আর কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়টি (কুবি) অল্প সময়েই দেশের উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)’এ কুবিয়ানদের ধারাবাহিক সাফল্য এখন সবার নজর কাড়ছে।
সীমিত অবকাঠামো, আবাসন সংকট কিংবা পর্যাপ্ত অ্যাকাডেমিক সহায়তার ঘাটতি, নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন স্বপ্নপূরণের পথে। প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, পরিকল্পনা, পররাষ্ট্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারে দিন দিন বাড়ছে কুবিয়ানদের উপস্থিতি।
পাহাড়ঘেরা এই ক্যাম্পাসে যারা ভর্তি হন, তাদের অনেকের মনেই জন্ম নেয় দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন। তবে ঢাকা কিংবা দেশের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো শুরু থেকেই এখানে বিসিএস প্রস্তুতির অনুকূল পরিবেশ ছিল না। প্রয়োজনীয় গাইডলাইন, রিসোর্স কিংবা কোচিং সুবিধার সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তবু থেমে থাকেননি কুবিয়ানরা। লাইব্রেরির নীরব টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি, সিনিয়রদের পরামর্শ আর নিজেদের অদম্য পরিশ্রমই আজ তাদের সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। প্রতিটি বিসিএস ফলাফলের পর নতুন করে আলোচনায় আসে কতজন কুবিয়ানের নাম এখানে উঠে এসেছে।
গত ৪১তম বিসিএসেই ১৩ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরমধ্যে সিংহভাগই শিক্ষা ক্যাডারে, এরপর রয়েছে পরিকল্পনা ক্যাডার।
৪৪তম বিসিএসে কুবিয়ানদের মধ্যে প্রশাসন ও শিক্ষা ক্যাডারে পাঁচজন। এছাড়াও কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারে ইন্সট্রাক্টর (নন টেক/পদার্থ) পদে একজন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
সর্বশেষ, ৪৯তম বিসিএসেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উজ্জ্বল করেছেন পাঁচজন শিক্ষার্থী। এভাবেই প্রতিটা বিসিএসেই মেধার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
৪৯তম বিসিএস (বিশেষ)-এ শিক্ষা ক্যাডারের গণিতের মেধাক্রমে প্রথম স্থান অর্জনকারী অলি উল্লাহ বলেন,”এই বিদ্যাপীঠের প্রতিটি কোণ এবং বন্ধুদের সাথে কাটানো সময় শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেয়নি, বরং জীবনের প্রতিকূলতা জয় করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আমার বিসিএস যাত্রায় শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং সহপাঠীদের অনুপ্রেরণা ছিল মূল চালিকাশক্তি।
তিনি আরো বলেন, ‘তাঁর এই পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তিনি, ৪৯তম বিসিএসে গণিত বিষয়ে মেধাক্রম-০১ এবং ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে (গণিত) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এই অনন্য অর্জন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামষ্টিক সক্ষমতা ও অদম্য সম্ভাবনার এক গর্বিত প্রতিফলন।’
তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর এই সাফল্য আগামী দিনের স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীদের মনে নতুন করে সাহস জোগাবে এবং সীমাবদ্ধতা যে স্বপ্নকে থামাতে পারে না-সেই সত্যকে প্রমাণ করবে। সঠিক ইচ্ছাশক্তি, কঠোর অধ্যবসায় এবং নিজের প্রতি অটল বিশ্বাস থাকলে এই ক্যাম্পাস থেকেই অনন্য সাফল্যের গল্প লেখা সম্ভব।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্রগতির জন্য তার কিছু প্রত্যাশাও রয়েছে, যার মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক লাইব্রেরি নির্মাণ করা অন্যতম, যা হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের আলো জ্বালাবে। পাশাপাশি বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতার দৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরিতে একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা জরুরি।
তিনি আরো আশা করেন যে, “ক্যাম্পাস আরও সমৃদ্ধ হবে, যা সাবেকদের মনে নস্টালজিয়া আর বর্তমানদের মনে সবসময় আকাশ ছোঁয়ার সাহস জাগিয়ে রাখবে।”
৪১তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ফজলে রাব্বি জানান, “বিসিএস পরীক্ষায় সফল হওয়ার পেছনে আমার বিভাগের শিক্ষক ও সহপাঠীদের দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ অনেক বড়ো শক্তি হিসাবে অবদান রেখেছে। বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ভাবে দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম যেটি পরবর্তী সময়ে এমনকি এখনও কর্মজীবনে কাজে লাগছে।”
তিনি আরো বলেন,” বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিতর্কের সাথে যুক্ত থাকায় বিশ্লেষণী চিন্তা, আত্মবিশ্বাস ও উপস্থাপনার দক্ষতা বিসিএস প্রস্তুতি বিশেষ করে ভাইবা পরীক্ষাকে অনেক সহজ করেছে।” পাশাপাশি বেশ কিছু সিনিয়র ও সাবেক শিক্ষার্থীর উন্নত চিন্তা-ভাবনা ও ক্যারিয়ারে সাফল্য দ্বারা সেসময়ে বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।”
অসুবিধার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তাদের সময়ে খুব সমৃদ্ধ অ্যালামনাই ছিলো না৷ এই অভাবটা যেন তিনি ভালোভাবে পূরণ করার কথা বলেছেন যাতে এখনকার ব্যাচগুলোকে একই শূন্যতা অনুভব করতে না হয়।
সফলতার জন্য তিনি সকলকে নিজের লক্ষ্য অবিচল থাকতে বলেছেন। তিনি বলেন,”পরিকল্পনামাফিক প্রতিদিন একটু একটু করে পড়লে ও নিয়মিত রিভিশন দিলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষেরদিকে ক্যারিয়ারের প্রস্তুতিতে তেমন একটা চাপ পরবে না। ”
৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত অর্থনীতি বিভাগের আরজিনা আক্তার বলেন,” বিসিএস সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ক্যাম্পাসের ভূমিকা অপরিসীম। ক্যাম্পাস জীবন হলো সঠিক দিকনির্দেশনা, সুশৃঙ্খল পড়াশোনা, গ্রুপ স্টাডি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে স্বপ্নের বিসিএস ক্যাডার হিসেবে গড়ে তোলার আদর্শ ভিত্তি।”
তিনি আরো বলেন,”ক্যাম্পাসে সমমনা বন্ধুদের সাথে গ্রুপ স্টাডি করা বিসিএস প্রস্তুতির সবচেয়ে কার্যকর একটি দিক। সহপাঠীদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, তথ্য আদান-প্রদান এবং মডেল টেস্টের প্রশ্ন সমাধান করলে কঠিন বিষয়গুলো সহজে আয়ত্ত করা যায়।”
তিনি বলেন, ‘এছাড়াও ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিকে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড়ো সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। তিনি বলেন,”শান্ত পরিবেশ এবং বিশাল বইয়ের সংগ্রহ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ দিতে এবং দীর্ঘ সময় পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ক্লাবগুলো শিক্ষা বিষয়ক কর্মশালা, সেমিনার বা মক টেস্টের আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে দারুণভাবে এগিয়ে রাখে। ”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অর্জন কেবল কয়েকজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য গর্বের এক অধ্যায়। নতুন শিক্ষার্থীরা বড়ো ভাই-বোনদের সাফল্যের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। তাদের মনে জন্ম নিচ্ছে নতুন বিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স, অবস্থান কিংবা সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা নয়; সঠিক লক্ষ্য, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যে-কোনো মঞ্চেই সাফল্য অর্জন সম্ভব।
আজ কুবির লাল পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাস শুধু শিক্ষার স্থান নয়, এটি হয়ে উঠেছে স্বপ্ন বুননের এক উর্বর ভূমি। এখান থেকেই তৈরি হচ্ছেন ভবিষ্যতের প্রশাসক, নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রের সেবক।
লাল পাহাড়ের এই ক্যাম্পাস থেকে আগামী দিনেও আরও শত শত ‘লালবাতির’ স্বপ্ন পূরণ হবে, এমন প্রত্যাশাই এখন কুবিয়ানদের। মেধা, সততা ও দেশপ্রেমকে সঙ্গে নিয়ে তারা দেশের উন্নয়ন ও সেবায় রাখবেন টেকসই অবদান, এমন বিশ্বাসই সবার।
বাবলু দেব,কুবি প্রতিনিধি 





















