মেস মালিকদের চরম স্বেচ্ছাচারিতা, অন্যায্য নিয়ম এবং যাতায়াতের পথে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীরা। মেসের অহেতুক কড়াকড়ি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দুর্ব্যবহার এবং ক্যাম্পাসের বাইরে বিশেষ করে বিনোদপুর এলাকায় চলাচলের সময় যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শেষে মেসে ফিরতে প্রায়ই দেরি হয় নারী শিক্ষার্থীদের। তবে মেস কর্তৃপক্ষের আরোপিত সময়ের কারণে চরম বিপাকে পড়তে হয় তাঁদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্ষণিকালয় ছাত্রীনিবাসে গ্রীষ্মে রাত ৮টা এবং শীতকালে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ফেরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। আমরা বেশির ভাগই শিক্ষার্থী, ক্লাস বা কাজ শেষে ফিরতে ৯টা-১০টা বাজতেই পারে। কিন্তু দেরি হলে পরিবারের কাছে ফোন করে চাপ দেওয়া হতো।’ অতিরিক্ত চাপের কারণে বাধ্য হয়ে তিনি মেস ছেড়ে দেন বলে জানান।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সাইপা ছাত্রীনিবাসের আরেক শিক্ষার্থী। সেন্ট্রাল ওরিয়েন্টেশনের দিন ৩০ মিনিট দেরি হওয়ায় তাঁকে মেসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে রাতে তাঁকে বান্ধবীর বাসায় থাকতে হয়েছিল। এ ছাড়া ওই মেসে মেসভাড়ার বাইরে প্রতি মাসে প্রায় ৭৪০ টাকা বিদ্যুৎ বিল দাবি করা এবং প্রতিবাদে মেসমালিক রূঢ় আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মেসে খাবারের অনিয়ম ও অন্যায্য অর্থ আদায়ের কথা জানান জননী প্যালেসের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘দুপুরে ক্লাস থাকায় ক্যাম্পাসে খেতে হলেও মেসে মাসে দুই হাজার টাকা খাবারের বিল দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। না খেলেও টাকা কাটত, অথচ অনেক সময় খাবারই পেতাম না।’ এ ছাড়া কক্ষে ইলেকট্রনিক পণ্য রাখার অজুহাতে তাঁর ব্যবহৃত কেটলি আটকে রেখে মেস ছাড়ার সময় আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
রোজা ছাত্রীনিবাসের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘খালার বিল’ বা বিদ্যুৎ বিলের কথা বলে প্রায়ই ভাড়া বাড়ানো হতো। দিনে মাত্র দুবার পানি দেওয়া হতো, যা ক্লাসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য মারাত্মক সমস্যা তৈরি করত। এ ছাড়া মেসের ফ্রিজে জায়গা থাকা সত্ত্বেও তাঁর খাবার বের করে মেঝেতে রেখে দেওয়া হতো, যা প্রায়ই বিড়ালে নষ্ট করত। এর প্রতিবাদ করায় মেস ছাড়ার সময় তাঁকে গালিগালাজ করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
মেসের ভেতরের এসব ভোগান্তির পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বাইরে যাতায়াতের সময় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। বিনোদপুর ফ্লাইওভার এলাকায় চার সপ্তাহ আগে হয়রানির শিকার হওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ একা ছিলাম, তাই কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। ওই এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে।’
২০২৪ সালের রমজান মাসে একই স্থানে হয়রানির শিকার হওয়া মারিয়া নামে অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কাউকে কিছু বলিনি, কারণ ভেবেছিলাম বলে কোনো লাভ হবে না। তবে বিনোদপুর এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল থাকলে হয়তো এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেকোনো সমস্যা নিয়ে এলে আমরা সমাধানের চেষ্টা করি। বিনোদপুর ফ্লাইওভারসহ যেসব এলাকায় শিক্ষার্থীদের মনে হয় নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে অবশ্যই টহল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।’ এ ধরনের গুরুতর পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রক্টর দপ্তরকে অবহিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন তিনি।