সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬ | ১৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২২ রবিউস সানী, ১৪৪৮ | সকাল ৬:৪৪:৩৫
শিরোনাম
● ১০ টাকার নোট তুলতে গিয়ে পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু ● প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ● তেজগাঁও কলেজ সরকারি করার দাবিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে স্মারকলিপি ● যানবাহনের গ্যাসের দাম বাড়াল বিইআরসি ● হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফেরাতে মাঠে ৫৪ কর্মকর্তা ● কূটনীতিক বহিষ্কারের মার্কিন দাবি নাকচ আরাঘচির ● সিনাইয়ে গাজার ৪০০ শিশুর স্কুল গড়লেন ফিলিস্তিনি শিক্ষক ● ২০ টাকার আলু ১৪ টাকায় ● এআই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ তদারকিতে কিম ● ইন্দোনেশিয়ায় ২ গণ্ডারের গর্ভধারণে বিপন্ন প্রজাতি রক্ষায় নতুন আশার আলো ● ১০ টাকার নোট তুলতে গিয়ে পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু ● প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ● তেজগাঁও কলেজ সরকারি করার দাবিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে স্মারকলিপি ● যানবাহনের গ্যাসের দাম বাড়াল বিইআরসি ● হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফেরাতে মাঠে ৫৪ কর্মকর্তা ● কূটনীতিক বহিষ্কারের মার্কিন দাবি নাকচ আরাঘচির ● সিনাইয়ে গাজার ৪০০ শিশুর স্কুল গড়লেন ফিলিস্তিনি শিক্ষক ● ২০ টাকার আলু ১৪ টাকায় ● এআই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ তদারকিতে কিম ● ইন্দোনেশিয়ায় ২ গণ্ডারের গর্ভধারণে বিপন্ন প্রজাতি রক্ষায় নতুন আশার আলো

মুক্ত বাতাসে বিষাক্ত নিঃশ্বাস: আমাদের রুচি ও চরিত্র কোন পথে?

সাবির আমিন রেজা
সাবির আমিন রেজা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২২
শেয়ার: mail
মুক্ত বাতাসে বিষাক্ত নিঃশ্বাস: আমাদের রুচি ও চরিত্র কোন পথে?

ছবি: এআই দ্বারা তৈরি (প্রতীকী ছবি)

সমাজে এখন এক অদ্ভুত ও মারাত্মক নৈতিক খরা চলছে, যা শিক্ষক, সমাজপতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর দেশের মানুষ যখন একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন ও মুক্ত পরিবেশের স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই যেন আমাদের দীর্ঘদিনের চেপে রাখা নৈতিক স্খলনগুলো এক নিয়ন্ত্রণহীন মহাসড়ক পেয়ে গেল।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের অবদমিত আদিম প্রবৃত্তিগুলো যখন হঠাৎ কোনো বড় সামাজিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়, তখন সুপ্ত ফ্রয়েডীয় ‘ইড’ বা পাশবিক সত্তা সামাজিক ‘সুপার-ইগো’ বা নৈতিক শাসনকে অমান্য করে এক ধরনের তীব্র স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নিতে চায়। স্বাধীনতা মানেই যে স্বেচ্ছাচারিতা নয়—এই সহজ সত্যটি মনে হয় আমরা কোথাও হারিয়ে ফেলেছি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমাজের প্রতিটি স্তরে রুচি, মূল্যবোধ ও চরিত্রের যে ভয়াবহ ধস নেমেছে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার এবং সামাজিক আত্মসমীক্ষার সময় এসেছে।

এটি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, চরিত্রের এই খরা বা রুচির দুর্ভিক্ষ অতীতেও ছিল। তবে তখনকার সময়ে সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক শাসন ও লোকচক্ষুর ভয় এসব স্খলনকে প্রকাশ্যে আসতে বাধা দিত। ফলে মন্দের হলেও একটা সীমা ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সেই সংকোচ ও লুকোছাপা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

আজ ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহের যুগে অর্থ উপার্জনের অন্ধ নেশা আমাদের গ্রাস করেছে—যেখানে নীতি-নৈতিকতার কোনো বাছবিচার নেই। সবকিছু হারালেও অর্থ চাই—এমন মানসিকতার কারণে ‘সুগার ড্যাডি’র মতো শব্দ ও অবক্ষয়ী সংস্কৃতিও সমাজে পরিচিত হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা আধুনিক হতে গিয়ে উল্টো আদিম ও পাশবিক হয়ে উঠছি।

ফলে সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও পরিবার আজ চরম ঝুঁকি ও অবিশ্বাসের মধ্যে পড়ছে। সর্বত্র তীব্র পারস্পরিক অনাস্থা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। নিষ্পাপ শিশু রামিসা—পাবনা সদরের কুলুনিয়া গ্রামের মাত্র ১০ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা, কিংবা অতি সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের ১৩ বছরের এক শিশুশিক্ষার্থীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড—আমাদের কোন সভ্যতার বার্তা দেয়? এসব ঘটনার পেছনে কোনো সুগভীর সামাজিক বা অপরাধমূলক চক্রান্ত রয়েছে কি না, তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সমাজের যে অংশটিকে আমরা ‘পথপ্রদর্শক’ বা ‘শ্রদ্ধার পাত্র’ মনে করতাম, আজ তাদের একাংশের নৈতিক পতন আমাদের স্তম্ভিত করে দিচ্ছে।

শিক্ষক, যিনি জাতি গঠনের কারিগর ও আলোর দিশারি, তাঁর কাছে যখন কোনো শিক্ষার্থী কিংবা নারী সহকর্মী অনিরাপদ হয়ে পড়েন, তখন আর বিশ্বাসের জায়গাটি কোথায় থাকে? একইভাবে, সমাজের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল কিংবা ধর্মীয় ভাবধারার ব্যক্তিরাই যখন চরম নৈতিক স্খলনে জড়িয়ে পড়েন, তখন তা কেবল নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং গোটা সমাজের জন্য তা হয়ে ওঠে এক চরম কলঙ্ক ও অভিশাপ।

সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের কিছু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে চরম নৈতিক অবক্ষয়ের গুরুতর অভিযোগ এবং তার জেরে পারিবারিক ট্র্যাজেডিতে অকাল মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনাগুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। এগুলো ক্ষমতার দাপট ও নৈতিকতাহীন আচরণে উচ্চপর্যায়ের পারিবারিক কাঠামো কীভাবে ভেঙে পড়তে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

যে হাতগুলোর সমাজ কিংবা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রক্ষা করার কথা, সেই হাতগুলোই যখন শৈশব ও সম্ভ্রমকে পিষে মারে, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক বিবেক আজ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্মজীবী নারীদের অনৈতিক সম্পর্কে বাধ্য করা এবং মুখ খুললে চাকরিচ্যুত করার যে অভিযোগ ও সংস্কৃতির কথা সামনে আসে, তা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত রূপ।

এই ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইন অমান্য করার নেতিবাচক সংস্কৃতি আজ আমাদের সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, যখন কোনো রাষ্ট্রে ‘আইনের শাসন’-এর চেয়ে ‘ব্যক্তির দাপট’ দীর্ঘসময় ধরে কাঠামোগত রূপ পায়, তখন জনগণের মধ্যে প্রচলিত বিধিবিধানের প্রতি এক ধরনের চরম অনীহা তৈরি হয়।

গায়ের জোরে পদ ও চেয়ার দখল করা এবং তা যেকোনো উপায়ে টিকিয়ে রাখার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ‘রেগুলেশন’ থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর বাস্তবায়নে উদাসীনতা রয়েছে। আবার বাংলাদেশে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় দিনে দিনে নৈরাজ্য বাড়ছে, যা সবকিছুকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার ও প্রশাসন এই প্রাতিষ্ঠানিক জট এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম দূর করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। হয়তো অচিরেই এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

তবে এই প্রক্রিয়ার সমান্তরালে মাঠপর্যায়ে কিছু স্ববিরোধিতাও দৃশ্যমান। যেখানে শিক্ষকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ও কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষভাবে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কর্তৃক সাধারণ শিক্ষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজরদারির পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এতে তাঁদের মধ্যে এক ধরনের পেশাগত সংকোচন তৈরি হচ্ছে।

যুক্তিবিদ্যার ‘দ্বান্দ্বিক নীতি’ অনুযায়ী, একদিকে শিক্ষকদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকে দৃশ্যমান রাখা এবং অন্যদিকে পরিপত্রের মাধ্যমে তাঁদের সাধারণ বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করা—এই দুটি নীতি পরস্পরবিরোধী। এই ধরনের প্রশাসনিক নজরদারির চেয়ে শিক্ষকদের নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের মানোন্নয়নে গঠনমূলক নীতি গ্রহণ করা হলে সুশাসন ও সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য আরও বেশি সফল হতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগে—আসলে এই অবক্ষয় হঠাৎ এতটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার কারণ কী?

সমাজবিজ্ঞানের বিখ্যাত ফরাসি তাত্ত্বিক এমিল ডুর্খেইমের মতে, কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে দীর্ঘস্থায়ী অবরুদ্ধ ব্যবস্থার পর হঠাৎ বড় ধরনের ভাঙন বা রাজনৈতিক রূপান্তর এলে মানুষের মধ্যে সামাজিক নিয়মহীনতার এক ক্রান্তিকাল বা ‘অ্যানোমি’ তৈরি হতে পারে।

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত শাসনতান্ত্রিক একনায়কত্ব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতিই এর অন্যতম কারণ হতে পারে। যখন পুরনো কাঠামোর নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও ধর্মীয় অনুশাসন শিথিল হয়ে পড়ে এবং নতুন সামাজিক চুক্তি তৃণমূল পর্যায়ে পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় নেয়, তখনই একশ্রেণির মানুষের সুপ্ত পাশবিকতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ক্ষতিকর প্রবণতা হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল একটি আইনের শাসনভিত্তিক মানবিক সমাজ, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বর্তমান প্রশাসন জনগণের সেই গণ-আকাঙ্ক্ষার ম্যান্ডেট রক্ষা এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে—এমন প্রত্যাশা ও মূল্যায়ন রয়েছে।

তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, নীতিগত সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সমাজজুড়ে একশ্রেণির মানুষের মধ্যে তীব্র অসহিষ্ণুতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভিন্নমত পোষণ কিংবা সামান্য স্বার্থের সংঘাতেই অবলীলায় খুনের মতো অপরাধ ঘটছে।

তবে আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এসব নির্মমতা বা পাশবিকতার মুখে সমাজ আজ অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবাদহীন, নির্বাক দর্শক। মানুষ আক্রান্তকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে সেই নির্মমতার ভিডিও ধারণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ বাড়িয়ে অর্থ উপার্জনের অন্ধ মোহে মেতে উঠছে—অনেকটা যেন রোম পুড়ে আর সম্রাট নিরুর বাঁশি বাজানোর আধুনিক ও ডিজিটাল সংস্করণ!

এই ধরনের মব-কালচার (মব জাস্টিস), তুচ্ছ ঘটনায় পিটিয়ে হত্যা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া ও ভাঙচুর করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো পাশবিক মানসিকতা একটি স্বাধীন ও সুস্থ রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অপরাধের বিচারহীনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্রতা ও বন্ধনগুলোও আজ এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি। প্রেমের নামে মানুষ আজ ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে। পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্কের টানে সমাজ-সংসার, এমনকি নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানকে ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনাও নিত্যদিনের খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্পর্কের এই বিকৃতি এখানেই থেমে নেই। পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতি এবং নৈতিকতা উপেক্ষা করে ঘর ছাড়ার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরুণী বা বিবাহিত নারী সম্পর্কের তথাকথিত সফল পরিণতির জন্য অনভিপ্রেত ও অস্থির সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা সমাজকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে।

যে সম্পর্কগুলোর ওপর ভিত্তি করে আমাদের সমাজ ও পরিবার টিকে ছিল, সেগুলোর এই ভয়াবহ ভাঙন প্রমাণ করে যে আমাদের ভেতরের রুচিবোধ, মানসিক শুদ্ধতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ কতটা নিচে নেমে গেছে—এমন প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

এই মহামারি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল একটি কাঠামোগত ব্যবস্থার বদল ঘটায়; মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক কলুষতা দূর করতে পারে না। অন্তরের এই ক্যানসার দূর করতে হলে আমাদের একদম গোড়া থেকে কাজ করতে হবে—

১. পারিবারিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন

সন্তানকে কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতায় না নামিয়ে, সবার আগে একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সততা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের পাঠ পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

২. ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঠিক চর্চা

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামসহ সব ধর্মই মানুষের জান, মাল ও সম্ভ্রমের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং অন্যায়, ব্যভিচার ও জুলুমকে নিষিদ্ধ করেছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসদাচরণ ও সীমালঙ্ঘন নিষিদ্ধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।” (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০)।

একই সঙ্গে সুরা আল-হুজুরাতে অপরের সম্ভ্রমহানি, উপহাস, অন্যায় ধারণা ও পরনিন্দাকে কঠোরভাবে নিষেধ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই ধর্মকে কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর মূল বাণী—অন্যায় না করা, অন্যের ক্ষতি না করা এবং মানবিক চরিত্র গঠন—জীবনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।

একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের অনৈতিকতা ও অপরাধমূলক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও আইনি নিরপেক্ষতা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্রে গায়ের জোরে চেয়ার বা জমি দখলের নোংরা সংস্কৃতি আজই বন্ধ করতে হবে। আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োগ বাস্তবে হতে হবে।

অপরাধী বা অনিয়মকারী যে দলের বা যে মতেরই হোক না কেন, তাকে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই কঠোর হুঁশিয়ারি আমাদের জন্য পরম আদর্শ, যেখানে তিনি পূর্ববর্তী জাতির ধ্বংসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, “তাদের মধ্যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি চুরি (অপরাধ) করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর কোনো দুর্বল লোক চুরি করলে তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৩৪৭৫)।

সুতরাং, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই নিরপেক্ষতার কোনো বিকল্প নেই।

৪. সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ও দ্বিমুখী নীতি পরিহার

শিক্ষকদের ওপর স্রেফ নজরদারি কিংবা পরিপত্রের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা হরণের চেয়ে তাঁদের পেশাদারিত্ব ও নৈতিক মানোন্নয়নে রাষ্ট্রকে বেশি জোর দিতে হবে।

অপসংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মরণথাবা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে খেলাধুলা, লাইব্রেরি আন্দোলন এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

আমরা আজ এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, বাহ্যিক স্বাধীনতা চিরকালই অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি মানুষের মন ও চরিত্র অবক্ষয়ের শৃঙ্খলে বন্দি থাকে।

রুচি ও চরিত্রের এই তীব্র খরা যদি আমরা এখনই রুখতে না পারি, তবে কোনো শাসনব্যবস্থাই কোনোদিন আমাদের একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সমাজ উপহার দিতে পারবে না।

আসুন, ক্ষমতার অনৈতিক অন্ধ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমরা প্রত্যেকে নিজের পরিবার, নিজের প্রতিষ্ঠান এবং নিজের মনকে শুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা করি। তবেই চলমান রাষ্ট্র সংস্কারের মহতী প্রচেষ্টা টেকসই রূপ পাবে, এই সামাজিক ক্যানসার থেকে আমাদের মুক্তির পথ তৈরি হবে এবং আমরা উপহার পাব একটি সত্যিকারের বৈষম্যহীন, সুন্দর ও রুচিশীল বাংলাদেশ।

লেখকঃ অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

মুক্ত বাতাসে বিষাক্ত নিঃশ্বাস: আমাদের রুচি ও চরিত্র কোন পথে?

বিস্তারিত কমেন্টে