ইতিহাসের চাকা কখনো এক জায়গায় থমকে থাকে না। চলন্ত চাকা যেমন সময়ের হাত ধরে নতুন গন্তব্যে পৌঁছায়, তেমনই নির্দিষ্ট সময় পরপর ইতিহাসও ভিন্ন প্রেক্ষিত ও নতুন চরিত্রে নিজেকে নতুন করে হাজির করে। কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের মানচিত্রে যখন আধিপত্যবাদের বিষাক্ত বিভীষিকার ছায়া এসে পড়ে কিংবা রক্তচোষা বাদুড়ের মতো শাসকগোষ্ঠী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নিতে চায়; ঠিক যখন ক্ষমতার দম্ভে একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ জোর করে জাঁকিয়ে বসে কিংবা ভিনদেশি মদদে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংকটের অমাবস্যায় নিমজ্জিত হয়ে জাতি এক গভীর সংকটাপন্ন সময়ে এসে উপনীত হয়—ঠিক তখনই ইতিহাস তার নিজস্ব নিয়মে রাজপথকে অগ্নিশিখার মতো বিপ্লবের লাল রঙে উত্তাল করে তোলে। স্বাধীনতা-পরবর্তী মহাকালের সেই সন্ধিক্ষণে ইতিহাস তার সোনালী পাতায় অবিস্মরণীয় ধ্রুবতারা হিসেবে তুলে ধরে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়াউর রহমান, দেশমাতৃকার টানে গৃহকোণ ছেড়ে রাজপথে আসা বেগম খালেদা জিয়া কিংবা নির্বাসনে থাকা মজলুম জননেতা তারেক রহমানের মতো নেতৃত্বকে।
অন্যদিকে, ইতিহাসের চাকা সচল রাখতে ক্ষুদিরাম বসুর মতো যুগে যুগে আত্মত্যাগের দীক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে সাধারণ জনতা ও বীর সিপাহিরা। এবং দেশপ্রেমিক কর্নেল আমিনের মতো দেশ ও আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাসী সৈনিকদের পাশাপাশি নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ নূর হোসেন, শহীদ নাজির উদ্দিন জেহাদরা এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে চাতক পাখির মতো স্বপ্ন বুকে নিয়ে আত্মোৎসর্গকারী আবু সাঈদ, ওয়াসিম ও মুগ্ধদের মতো অকুতোভয় তরুণেরা ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লিখে যায় রক্তের অক্ষরে।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেশ ও রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া তিনটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে—১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের ‘সিপাহী-জনতা অভ্যুত্থান’, ১৯৯০-এর ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন (গণ-অভ্যুত্থান)’ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তস্নাত ‘ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান’। এই অভ্যুত্থানগুলোর প্রেক্ষাপট ও সময় ভিন্ন হলেও এগুলোর ভেতরের মূল সুরটি ছিল একদম একই: দেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, কোনো বহিরাগত বা অভ্যন্তরীণ আধিপত্যের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমে থাকা ক্ষোভের ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ ঘটানো।
১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। স্বাধীনতার পরপরই রাজনৈতিক অস্থিরতা, একদলীয় ব্যবস্থার চাপ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক বলয়ের নানামুখী টানাপোড়েনে পড়ে নতুন জন্ম নেওয়া এই দেশ। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের আত্মচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠা এই জনপদ এবং একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ভিনদেশি প্রভাব ও আঞ্চলিক আধিপত্য থেকে নিজের স্বাধীনতা ও জাতীয় অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার তাগিদ তখন প্রবল হয়ে উঠেছিল।
বিশিষ্ট সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ’ (Bangladesh: A Legacy of Blood)-এ পঁচাত্তরের এই কঠিন সময়টিকে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম সংকটময় মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৩ নভেম্বরের ঘোর অন্ধকার ও সামরিক অস্থিরতার পর ৭ই নভেম্বর সকালে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। উল্লেখ্য যে, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এবং ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের তৎকালীন কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন সামরিক সদস্যদের অভিযানে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। পরবর্তী সময়ে খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।
৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে চরম অনিশ্চয়তা, সংশয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রজুড়ে চলতে থাকে নানা সমীকরণ ও পালাবদল। সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
এমন এক অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতায়, ৭ নভেম্বর যখন খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিল বঙ্গভবনকেন্দ্রিক ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার উদ্যোগ গড়ে ওঠে। দেশপ্রেমিক সিপাহী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। দিকহারা ও অভিভাবকহীন দেশকে সঠিক দিশা দিতে সেদিন জনতা সেনানিবাসের দিকে ছুটে যায় এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।
তৎকালীন পত্রিকা ও সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, পুরো শহরের অলি-গলিতে সাধারণ মানুষের মিছিল থেকে তখন কিছু স্লোগান বারবার গর্জে উঠছিল:
“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ”
“নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার!”
“রুশ-ভারতের দালালরা, হুঁশিয়ার সাবধান!”
“সিপাহী-জনতা ভাই ভাই…”
এই ক্ষোভ কেবল কোনো সামরিক দলবাজির অংশ ছিল না, এটি ছিল নিজ ভূখণ্ডে ভিনদেশি নাক গলানোর বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষের এক স্বতঃস্ফূর্ত দেশপ্রেমের বার্তা। সেই সিপাহী-জনতার ঐক্য সেদিন পুরো বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক ক্ষমতালোভী হায়নাদের হাত থেকে এক মজবুত নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন পরিচয় ধরে রাখার সাহস পায়।
পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরাচার হটিয়ে দেশ গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু তিন দশক পর এসে বাংলাদেশকে আবারও এক নজিরবিহীন স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশ আবারও এক নতুন মোড়ের মুখোমুখি দাঁড়ায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে এ দেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে রক্তক্ষয়ী দমনপীড়ন, শত শত জীবন আর হাজার হাজার মানুষের অকাতর ত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই অত্যাচারী শাসককে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। শিক্ষার্থীদের এই লড়াইয়ে নিমেষেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যোগ দেয় শ্রমিক, দিনমজুর, অভিভাবকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। নতুন করে জন্ম নেয় এক ঐতিহাসিক শব্দ—‘ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান’।
পঁচাত্তরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান যেমন ছিল বাহ্যিক চক্রান্ত ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তেমনই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ‘আয়নাঘর’, গুম, ভোটের অধিকার হরণ এবং জনগণের ওপর চেপে বসা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায়। পঁচাত্তরে সিপাহীরা যেভাবে জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এক হয়েছিল, চব্বিশে এসে গুলি ও শাসকের ভয় উপেক্ষা করে দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতা একইভাবে চরম আত্মত্যাগের নজির দেখিয়েছে।
সিপাহী-জনতা থেকে শুরু করে আজকের ছাত্র-জনতা—বিগত পাঁচ দশকের ইতিহাস বারবার একটি সত্যই প্রমাণ করেছে: এ দেশের মানুষ কখনো নীরব দর্শক হয়ে থাকে না; সংকটমুহূর্তে তারাই দেশের মূল শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৫ সালে সিপাহী ও জনতার কাঁধ মেলানো যে জাতীয় সংহতির বার্তা দিয়েছিল, ২০২৪-এর তরুণদের রক্তে অর্জিত বিজয় সেই একই চেতনাকে নতুন প্রজন্মের ধমনিতে নতুন করে ছড়িয়ে দিল।
আজকের এই মুক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে আমাদের একটা বিষয় গভীরভাবে বুঝতে হবে—অভ্যুত্থান কেবল শাসক বদলানোর হাতিয়ার নয়, এটি রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ার এবং স্বাধীনতাকে সত্যি সত্যি অর্থবহ করার এক বড় সুযোগ। ১৯৭৫-এর সিপাহী-জনতা যে স্বাধীনতার ভিত্তিকে রক্ষা করেছিল, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তে তা আবার প্রাণ ফিরে পেল। এখন সময় এসেছে সব সংকীর্ণতা ভুলে এই জনআকাঙ্ক্ষাকে লালন করা এবং একটি আত্মমর্যাদাশীল, বৈষম্যহীন ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ে তোলা; যার মূলমন্ত্র হবে—“করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”
লেখক: শাহাদাত হোসেন শাকিল, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও যুগ্ম আহ্বায়ক, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদল