মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ | ২০ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২৩ রবিউস সানী, ১৪৪৮ | বিকাল ৫:০৬:৩৫
শিরোনাম
● ছাত্রদলে ছাত্র নেই মন্তব্যে সালমান মুক্তাদিরকে নাছিরের আমন্ত্রণ ● বড়াইগ্রামে নিখোঁজের ৬ দিন পর যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার ● চেয়ারের রাজনীতি ও শিক্ষকতা: শিক্ষক দিবসের অম্লমধুর ব্যবচ্ছেদ ● একসঙ্গে ৩০ ব্যাংকের কার্ডসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ, যা করণীয় ● উত্তাল দিল্লি, আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা ● ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সমন্বয় হলে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব: বিশ্বব্যাংক ● ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা ● বাগাতিপাড়ায় ফ্ল্যাটের তালা-হ্যাজবোল্ট কেটে স্বর্ণালংকারসহ মালামাল চুরি ● রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, শাস্তির দাবিতে বেরোবিতে মানববন্ধন ● পরীক্ষার খাতা হারানোর অভিযোগ ইবি উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে, তদন্তে কমিটি ● ছাত্রদলে ছাত্র নেই মন্তব্যে সালমান মুক্তাদিরকে নাছিরের আমন্ত্রণ ● বড়াইগ্রামে নিখোঁজের ৬ দিন পর যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার ● চেয়ারের রাজনীতি ও শিক্ষকতা: শিক্ষক দিবসের অম্লমধুর ব্যবচ্ছেদ ● একসঙ্গে ৩০ ব্যাংকের কার্ডসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ, যা করণীয় ● উত্তাল দিল্লি, আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা ● ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সমন্বয় হলে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব: বিশ্বব্যাংক ● ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা ● বাগাতিপাড়ায় ফ্ল্যাটের তালা-হ্যাজবোল্ট কেটে স্বর্ণালংকারসহ মালামাল চুরি ● রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, শাস্তির দাবিতে বেরোবিতে মানববন্ধন ● পরীক্ষার খাতা হারানোর অভিযোগ ইবি উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে, তদন্তে কমিটি

চেয়ারের রাজনীতি ও শিক্ষকতা: শিক্ষক দিবসের অম্লমধুর ব্যবচ্ছেদ

সাবির আমিন রেজা
সাবির আমিন রেজা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫০
শেয়ার: mail
চেয়ারের রাজনীতি ও শিক্ষকতা: শিক্ষক দিবসের অম্লমধুর ব্যবচ্ছেদ

 

 

মানুষ গড়ার আদি কারিগরই হলেন শিক্ষক। একটি অবুঝ শিশুকে অন্ধকার থেকে আলোর জগতে নিয়ে আসার যে সুকঠিন ব্রত, তারই নাম শিক্ষকতা। সমাজের প্রয়োজন শুধু তথ্যের আদান-প্রদান নয়, প্রয়োজন নৈতিকতার সঞ্চার। আর এই নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষকের বিকল্প কোনো প্রযুক্তি আজও তৈরি হতে পারেনি। শিক্ষক হলেন একটি জাতির চালিকাশক্তি, যিনি ভেতরে আলো জ্বেলে বাইরে মানুষ তৈরি করেন।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, শিক্ষকেরা সমাজে সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে এসেছেন তাঁদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই সম্মানের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। যখন শিক্ষক নিজের জ্ঞান বিতরণের চেয়ে দলাদলি, পদ-পদবি আর বৈষয়িক লোভকে বড় করে দেখেন, তখনই তাঁর সম্মানহানি ঘটে। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে তাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ক্লাসরুমের চেয়ে রাজনৈতিক নেতার বৈঠকখানায় বেশি সময় কাটাচ্ছেন, রাজপথে কোনো দলের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছেন বা সাধারণ মানুষের কাতারে মিশে ‘আমার ভাই, তোমার ভাই’ বলছেন, কিংবা কোনো অনৈতিক সুবিধা বা লালসার বশবর্তী হয়ে খাতার মূল্যায়নে তারতম্য করছেন, তখন শ্রদ্ধার আসনটি ক্ষোভে রূপ নেয়।

একসময় আমাদের সমাজে শিক্ষকদের সবচেয়ে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসের মানুষ বলে মনে করা হতো। দল-মত নির্বিশেষে সবাই তাঁদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং সামাজিক অভিভাবক হিসেবে বিশ্বাস করতেন। সেকালের শিক্ষকেরা ছিলেন পরম নিষ্ঠাবান। তাঁরা অত্যন্ত যত্ন ও সততার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে পেশাগত আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধের চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ক্লাস নেওয়া, খাতা দেখা কিংবা পরীক্ষার দায়িত্ব পালনে এক ধরনের উদাসীনতা এবং কেবল দায়সারাভাবে কাজ শেষ করার যে নেতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং সত্যিকারের মানুষ হওয়ার এক অনন্য সিঁড়ি। আমাদের সমাজে অনেকেই শিক্ষককে ভাবেন একজন কড়া শাসক, যিনি পরীক্ষার খাতায় বা ভাইভা বোর্ডে পাস-ফেলের ভাগ্য ঠিক করেন। কিন্তু এই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক পরম শুভাকাঙ্ক্ষীর রূপ। একজন মানবিক শিক্ষক শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচাতে কঠোর নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতেও দ্বিধা করেন না। শিক্ষাজীবন থেকে কোনো ছাত্র যেন ছিটকে না যায়, ড্রপআউট বা রিটেক ঠেকাতে তিনি পরম মমতায় পাস নম্বরের চেয়ে কিছুটা কম পাওয়া ছাত্রকেও টেনে পাস করিয়ে দেন।

প্রকৃতপক্ষে, একজন আদর্শ শিক্ষক হলেন একজন অভিভাবক, একজন পিতা। নিজের সন্তান আর ক্লাসরুমের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি কখনো তফাত করেন না। শিক্ষার্থীরা বয়সে তরুণ ও অবুঝ; তাদের ভুল করা বা হুট করে বেয়াদবি করাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু শিক্ষক তো অবুঝ হতে পারেন না, তাঁর আসনটি পরম পরিপক্বতা ও ধৈর্যের। আমাদের চারপাশে এমন অনেক ছাত্র আছে, যারা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি করে নিজের পড়ার খরচ চালায় এবং বাবা-মার সংসারেও টাকা জোগায়। একজন সংবেদনশীল শিক্ষক এই শিক্ষার্থীদের পেছনের কঠিন সংগ্রামটা পরম মমতায় নিজের বুকে অনুভব করেন। তাই খাতা মূল্যায়নের সময় তিনি কঠোর যান্ত্রিক হিসাবনিকাশ দূরে ঠেলে একজন পরম দয়াশীল ও দায়িত্বশীল বিচারক হয়ে ওঠেন।

শিক্ষকদের চরিত্র ও নৈতিকতা সবসময় এমন হওয়া উচিত, যা দেখে সবাই শিখতে পারে। তাঁরা যেহেতু সমাজের আলো এবং মানুষ গড়ার কারিগর, তাই তাঁদের এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা পুরো শিক্ষক সমাজ তথা গোটা জাতির জন্য লজ্জার কারণ হয়। শিক্ষকদের যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখা উচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষাঙ্গনে আজ প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। অনেক সময় কুচক্রী সহকর্মীর উসকানি ও পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের প্রতি কঠোর ও অন্যায্য আচরণ করেন। স্রেফ অন্ধ আবেগ বা সহকর্মীর সাজানো মিথ্যাকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার কারণে এমন ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত একজন সম্ভাবনাময় ছাত্রের পুরো জীবনটাই ধ্বংস করে দেয়।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, যখন অনেক পরে সত্যটা প্রকাশ পায় এবং শিক্ষকেরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন, তখন আর আফসোস করে কোনো লাভ হয় না। নির্দোষ ছাত্রটির ভবিষ্যৎ ততক্ষণে চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়, আর এই ভয়ংকর অপরাধবোধ শিক্ষককে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই প্রতিটি সচেতন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব হলো—এমন হিংসুটে ও সংকীর্ণমনা সহকর্মী থেকে সবসময় দূরে থাকা এবং যেকোনো অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষকের আসল কাজ হলো একজন সঠিক বিচারক হওয়া, যাঁর মূল লক্ষ্য থাকবে সবসময় ছাত্রদের কল্যাণ করা এবং পরম মমতায় তাদের পাশে দাঁড়ানো।

শিক্ষকের আসল রূপ কেমন হওয়া উচিত, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ঘটনার দিকে তাকালে অনুধাবন করা যায়। নবম শ্রেণির এক দরিদ্র ছাত্র পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ বিদ্যার ছকে বর্ষার রোমান্টিকতা না লিখে লিখেছিল তার রিকশাচালক বাবার বৃষ্টির দিনের অভাবের নির্মম সত্য। খড়ের ছাদ চুয়ে পানি পড়া আর পেট ভরে ভাত না খেতে পাওয়ার সেই করুণ গল্প পড়ার পর কোনোভাবেই তাকে অকৃতকার্য করানোর মতো নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারেনি শিক্ষকের পিতৃত্বসুলভ মন। যান্ত্রিক নিয়মের বাইরে গিয়ে লাল কালি দিয়ে তাকে ঠিক পাস নম্বর লিখে দিয়েছিলেন সেই শিক্ষক। শুধু তাই নয়, খাতার নিচে পরম মমতায় লিখে দিয়েছিলেন, “তোমার জীবনের মেঘ কেটে যাক, আলো আসুক।” শিক্ষকের সেই সামান্য সহানুভূতিই ওই অবুঝ ছেলেটির জীবন বদলে দিয়েছিল, যে পরবর্তীতে স্বাবলম্বী হয়ে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। চাটুকারিতা আর প্রশাসনিক চেয়ারের মোহের চেয়ে একজন শিক্ষকের এই মানবিক রূপটিই আজ সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

শিক্ষকের পেশাগত মহত্ত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কতটা গভীর, তা দেড়শ বছরেরও বেশি সময় আগে অনুধাবন করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন। ১৮৬৩ সালে গেটিসবার্গে ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকা এই দূরদর্শী নেতা তাঁর আট বছর বয়সী পুত্রের প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের জন্য এক অনন্য দিকনির্দেশনা। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন—“মাননীয় মহোদয়, আমার পুত্রকে জ্ঞান অর্জনের জন্য আপনার কাছে পাঠালাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন—এটাই আপনার কাছে আমার প্রত্যাশা। তাকে অবশ্যই শেখাবেন, সব মানুষ ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ নয়। তাকে শেখাবেন, পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মূল্যবান।”

চিঠির পরবর্তী অংশে লিংকন শিক্ষককে অনুরোধ করেন, তাঁর সন্তানকে যেন পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করার শালীনতা শেখানো হয়। হুজুগে মাতাল জনতার অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের বিশ্বাসের ওপর অবিচল আস্থা রাখা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং অসদুপায়ে পাসের চেয়ে সসম্মানে অকৃতকার্য হওয়ার যে পরম মর্যাদা—তা যেন সে শিক্ষকের কাছ থেকেই শেখে। তিনি চেয়েছিলেন, শিক্ষক যেন তাঁর পুত্রকে কঠোরের প্রতি কঠোর এবং ভালো মানুষের প্রতি ভদ্র হওয়ার ভারসাম্য শেখান। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এই ঐতিহাসিক আহ্বান প্রমাণ করে—যুগের পরিবর্তনেও শিক্ষকের মূল কাজ কেবল যান্ত্রিক সিলেবাস শেষ করা বা ফল নির্ধারণ নয়, বরং একটি শিশুকে বাস্তব পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন নীতিবান, আত্মবিশ্বাসী ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনগুলোর অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচনের মানদণ্ড রাতারাতি বদলে যাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা কিংবা শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার চেয়ে সেখানে বরাবরই মুখ্য হয়ে ওঠে দলীয় আনুগত্য কিংবা বিগত আন্দোলনে কার কী ভূমিকা ছিল। ক্ষমতা বদলের চিরাচরিত সমীকরণে একদল শিক্ষক লাঞ্ছিত হন, পদ হারান, এমনকি আইনি জটিলতায় পড়েন; আর বিপরীত মেরুর আরেকদল শিক্ষক, যাঁদের একমাত্র যোগ্যতা দলীয় লেজুড়বৃত্তি, তাঁরা রাতারাতি বড় বড় প্রশাসনিক চেয়ার দখল করে বসেন। তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতির জন্য বহিরাগত রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে শিক্ষকেরা নিজেরাই বেশি দায়ী। এটি মূলত শিক্ষকদের একাংশের চারিত্রিক দুর্বলতা ও নৈতিক স্খলনেরই ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ। মেধা ও যোগ্যতার ওপর আস্থা হারিয়ে যখন শিক্ষকেরা নিজেরাই সস্তা সুযোগ-সুবিধা এবং পদের লোভে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকে বেছে নেন, তখনই এই অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এই সুযোগসন্ধানী মানসিকতার কারণেই শিক্ষাঙ্গনে স্রেফ প্রশাসনিক চেয়ার দখল করার জন্য এক শিক্ষক অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার মতো অপকৌশল বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। সহকর্মীকে মিথ্যা অপবাদে জড়িয়ে হয়রানি করা কিংবা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে অনৈতিকভাবে দীর্ঘ সময় পদ আঁকড়ে থাকার এক নেতিবাচক চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এই শ্রেণির শিক্ষকেরা মূলত কাগজে-কলমে পদধারী হলেও শ্রেণিকক্ষ কিংবা গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তোষামোদিতেই ব্যস্ত থাকেন। এমনকি নিজ সহকর্মী বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন নিপীড়নের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনাও দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করে আসছে, যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হলে পুরো শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়। যোগ্যতা যেখানে গৌণ হয়ে যায়, সেখানে দলীয় দাসত্বকে মুখ্য মানদণ্ডে পরিণত করার পেছনে শিক্ষকদের এই আপসকামী চরিত্রই প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এই আত্মঘাতী বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে শিক্ষাঙ্গনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর কোনোদিনই সম্ভব নয়।

আব্রাহাম লিংকনের চিঠির মূল সৌন্দর্য ছিল—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি তথা সরকারপ্রধান নিজে ক্ষমতার দম্ভ ভুলে শিক্ষকের পবিত্র আসনের সামনে এক বাবার আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আমরা ঠিক এর বিপরীত মেরুর এক ট্র্যাজিক রূপান্তর দেখে আসছি। এখানে ক্ষমতার বলয়ে থাকা একশ্রেণির শিক্ষকই বরং রাজনৈতিক প্রভুদের চাটুকারিতা করতে নিজেদের মেরুদণ্ড বিসর্জন দিচ্ছেন। সবচেয়ে বড় তামাশাটি দেখা যায় প্রতি বছর শিক্ষক দিবসে বা বিশেষ রাষ্ট্রীয় আয়োজনে যখন ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ দেওয়া হয়।

বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন শাসন আমল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গুণী শিক্ষক নির্বাচনের মূল ক্রাইটেরিয়া বা ধরন বদলে যাওয়ার একটি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক সময় অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা ও গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক বা আদর্শিক আনুগত্যই সম্মাননা ও পদক পাওয়ার ক্ষেত্রে অলিখিত মানদণ্ড হিসেবে প্রাধান্য পায়। ফলে, যে শিক্ষক আব্রাহাম লিংকনের চিঠির আদর্শ ধারণ করে শিক্ষার্থীদের মানবিক হতে শেখান, হুজুগে মাতাল জনতার পথ অনুসরণ করতে বারণ করেন কিংবা চাটুকারিতার বদলে মেধার সত্যকে আঁকড়ে ধরেন—তিনি অনেক ক্ষেত্রেই অবমূল্যায়িত থেকে যান। গুণী শিক্ষক নির্বাচনের এই প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড বদলে যাওয়ার ধারাটি প্রকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের সমাজেই শুধু লজ্জিত করছে না, বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক আদর্শকে ম্লান করে দিচ্ছে। এই নেতিবাচক ধারার অবসান ঘটিয়ে পুরস্কার ও সম্মাননার ক্ষেত্রে মেধা, সততা ও প্রকৃত শিক্ষকতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

প্রতি বছর ৫ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস আসে ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই দিবসের প্রকৃত সার্থকতা আসলে কোথায়? সেই সব ভঙ্গুর প্রশাসনিক চেয়ারে বসা ব্যক্তিদের মাঝে, যাঁরা সাময়িক ক্ষমতার জোরে মঞ্চ আলো করে বসেন? নাকি সেই সুবিধাবঞ্চিত, সততার সঙ্গে অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালনকারী নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের মাঝে, যাঁরা শত অভাবের মধ্যেও নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দেননি? শিক্ষক দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজ চাটুকারিতার বলয় ভেঙে মেধা ও যোগ্যতাকে মূল্যায়নের প্রধান শর্ত হিসেবে গ্রহণ করবে। যেদিন একজন শিক্ষককে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, বরং তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার মাপকাঠিতে বিচার করা হবে, সেদিনই এই দিবস পালন প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে। নয়তো প্রতি বছর এই দিনটি আসবে কেবলই এক মেকি আনুষ্ঠানিকতা আর আত্মপ্রবঞ্চনার দলিল হয়ে।

শিক্ষক দিবসের এই অম্লমধুর ব্যবচ্ছেদে একটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট—শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষকের নিজস্ব বিবেক ও নৈতিকতার সুরক্ষা। রাষ্ট্র ও সমাজকে যেমন চাটুকারিতার সংস্কৃতি ভেঙে যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, ঠিক তেমনি শিক্ষকদেরও আত্মোপলব্ধি করতে হবে। শিক্ষকের আসল শক্তি কোনো প্রশাসনিক পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে নয়, বরং তাঁর অর্জিত জ্ঞান এবং শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায়। যেদিন শিক্ষাঙ্গন থেকে দলীয় লেজুড়বৃত্তির অবসান ঘটবে এবং শিক্ষকেরা দৃপ্তকণ্ঠে বলতে পারবেন—“আমরা কোনো দলের নই, আমরা দেশের ও আলোর কারিগর”, সেদিনই কেবল এই নেতিবাচক চক্রব্যূহ থেকে মুক্তি মিলবে। আর তবেই প্রতি বছরের ৫ই অক্টোবর কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতা বা আনুষ্ঠানিকতার বৃত্তে বন্দী না থেকে, উদযাপিত হবে একটি মর্যাদাবান ও বিবেকবান জাতির পুনর্জন্মের উৎসব হিসেবে। জয় হোক সেই সব অ্যাকাডেমিশিয়ান নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের।

লেখক: অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা 

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

চেয়ারের রাজনীতি ও শিক্ষকতা: শিক্ষক দিবসের অম্লমধুর ব্যবচ্ছেদ

বিস্তারিত কমেন্টে