স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে, দৃশ্যমান বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং জাতীয় আয়ের আকারও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। কিন্তু আমাদের সামগ্রিক নগরায়ণের একটি চিরচেনা দৃশ্য আজও যেন এক বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হলো—ফুটপাত, রাস্তা, নদী ও খালপাড়ের বস্তি বা দোকানপাট উচ্ছেদের অন্তহীন ও চক্রাকার প্রক্রিয়া।
কিছুদিন পর পর মহাসমারোহে শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। কখনো দিনে, কখনো রাতে; কখনো নোটিশ দিয়ে, আবার কখনো পর্যাপ্ত নোটিশ ছাড়াই। বুলডোজার দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ভাসমান মানুষের ক্ষুদ্র সম্বলটুকু। ট্রাকভরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের ভাঙাচোরা মালামাল। কিন্তু উচ্ছেদের কয়েক দিন পরই দৃশ্যপট আবার আগের মতো হয়ে যায়। তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এই অন্তহীন চক্রের শেষ কোথায়? এতে কার লাভ, কার ক্ষতি, আর রাষ্ট্র বা জনগণেরই বা কী চূড়ান্ত অর্জন?
তবে বর্তমান জনবান্ধব ও দূরদর্শী সরকারের প্রতি জনগণের যে গভীর প্রত্যাশা রয়েছে, তা এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের পথ উন্মোচন করবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
সম্প্রতি ফার্মগেট এলাকার ফুটপাতে হঠাৎ এক তীব্র হৈহুল্লোড় আর দৌড়াদৌড়ির দৃশ্য নজরে এলো। উচ্ছেদকারী দলের উপস্থিতি টের পেয়ে হকাররা যে যার মতো পারছে, নিজ নিজ মালামাল নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটছে। বিকেলবেলা ওই পথ দিয়ে ফেরার সময় দেখা গেল, রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাঠের টুকরো, পলিথিন আর নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু পণ্য। মনে হলো, যেন সেখানে এক ছোটখাটো ঝড় বয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের কেউ গালে হাত দিয়ে, আবার কেউ চরম চিন্তাগ্রস্ত চোখে তাকিয়ে ভাবছে—এখন তারা কী করবেন? কীভাবে চলবে তাদের সংসার?
অথচ এর কয়েক গজ দূরেই দেখা গেল, আরেক দল মানুষ আবার নতুন করে বাঁশ-কাঠ দিয়ে দোকান বা পণ্য সাজানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই দৃশ্য প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসনের এই হুটহাট উচ্ছেদ প্রক্রিয়া আসলে কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না। এটি কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা কিংবা মূল সংকটকে আড়াল করার এক নিষ্ফল অপপ্রয়াস বৈ কিছু নয়। আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে।
মাঝে মাঝে অটোরিকশার বেলায়ও এমন চিত্র দেখা যায়। নানান অজুহাত দেখিয়ে তা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু কিছুদিন পরই আবার চালু হয়—যার ভেতরের সমীকরণ সাধারণ জনগণ নিজেদের মতো করে প্রতিনিয়ত আলোচনা করতে থাকে। তবে এ দেশের মানুষের গভীর বিশ্বাস, সাধারণ জনগণের অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গঠিত বর্তমান জনবান্ধব সরকার মাঠ পর্যায়ের এই ধরনের অন্যায্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কঠোর হাতে দমন করবেন এবং একটি স্বচ্ছ নগর ব্যবস্থা উপহার দেবেন।
একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি মানুষের আশা ও আস্থা দুটোই আকাশচুম্বী। বর্তমান সরকার নতুন নতুন আইন ও নীতিমালা তৈরি করছে ভবিষ্যৎ জনকল্যাণের জন্য, যা অতীতের যেকোনো ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাকে সংশোধন করে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করছে। তবে নীতিনির্ধারণী মহলের জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্তগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের সময় ক্ষেত্রবিশেষে তদারকি ও প্রচারের সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষকে কিছুটা সাময়িক ভোগান্তিতে ফেলতে পারে। এতে দিনশেষে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্যগুলোও জনগণের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
যেমনটা আমরা সম্প্রতি দেখেছি সম্পত্তি হস্তান্তরের বেলায় মূলধনী কর আরোপের ঘটনায়। ২০২৩ সালের কর আইন সংশোধন করে যেভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর প্রচলিত উৎস করের পাশাপাশি অতিরিক্ত মূলধনী কর ধার্যসহ নানা জটিল সংশোধন আনা হলো, তার কতেকাংশ সাধারণ মানুষকে কিছুটা বিভ্রান্তির মুখে ফেলেছে। মানুষ জানত উৎস করই মূলধনী কর। কিন্তু হঠাৎ এই নতুন নিয়মে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও হয়রানি বেড়েছে।
গত অর্থবছরেই সরকার এই বিষয়ে মানুষকে ইঙ্গিত দিয়ে রাখতে পারতেন কিংবা জনমত গড়তে মতামত নিতে পারতেন। যেভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণশুনানির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণে জনগণের মতামতকে সম্মান জানানো হয়, করের বেলায়ও তেমনটা করা যেত কি না, নীতিনির্ধারকেরা ভাবতে পারেন। তাহলে সর্বস্তরের নাগরিক সরকারের এই সংস্কারমুখী কার্যক্রমকে আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানাতেন এবং জনগণ আনন্দিত মনে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সরাসরি শরিক হতেন। অর্থাৎ, সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্যভেদ করতে পারতেন।
মানুষের অতি কাঙ্ক্ষিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও প্রশ্নাতীতভাবে বেশি। তাই সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে এমন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কৌশলী হওয়া উচিত কি না, সেটি নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। তা না হলে ছোট ছোট ঘটনা থেকেই একসময় বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকারের গতিশীল ও প্রজ্ঞাবান নীতিনির্ধারকমহল এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং দ্রুত একটি সহজ ও করদাতাবান্ধব স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করবেন।
প্রকৃতপক্ষে, কোনো ছিন্নমূল বা বেকার মানুষ যখন ফুটপাতে, বিভিন্ন স্টেশনে বা খোলা আকাশের নিচে ঘুমায় কিংবা পসরা বিছিয়ে বসে, তা নিশ্চয়ই কোনো সুখে বা বিলাসিতায় নয়। পেটের দায়ে, মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়েই তারা এই চরম কষ্টের জীবন বেছে নেয়।
কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে উঠে আসা এক হৃদয়স্পর্শী চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাস্তবতার নির্মমতা। এক নারী কোটি টাকার ব্যবসায়িক লোকসানে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে শেষমেশ ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসা খুলে বসেছেন—কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে, নিজের সংসার ও অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে।
অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের এক বিশাল অংশ কম টাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ও জীবনধারণ করতে এই ফুটপাতের ওপরেই ভরসা করে। ফলে ফুটপাত কেবল বিক্রেতার নয়, কোটি ক্রেতারও এক অদৃশ্য জীবনরেখা।
তাছাড়া, ফুটপাতে দোকানপাট করা বা পসরা বিছিয়ে বসা কোনো সহজ কাজ নয়। সেখানে বসতে গেলেও পোহাতে হয় নানা ঝামেলা, সইতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের অন্যায্য কর্তৃত্ব এবং দিতে হয় নিয়মিত অঘোষিত আর্থিক মাসুল। এই অলিখিত ও অনানুষ্ঠানিক মৌখিক অনুমতির পেছনে যে বিশাল অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক সচল থাকে, মাঠ পর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় সেই মূল শিকড়ে হাত না দিয়ে কেবল দৃশ্যমান হকারদের ওপর বলপ্রয়োগ করে। দিনশেষে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বর্তমান সরকারের সামগ্রিক জনপ্রিয়তার ওপরও।
মাঠ পর্যায়ের উচ্ছেদ অভিযানকে ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, কেবল কয়েকজন হকারকে সরিয়ে দেওয়া হলো এবং রাস্তা পরিষ্কার করা হলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই চটকদার দৃশ্যের গভীরে রয়েছে একটি বিশাল ও অদৃশ্য অর্থনৈতিক সরবরাহ শৃঙ্খল, যা এক ঝটকায় ভেঙে দেওয়া হয়।
প্রথমত, এই দোকানগুলোতে যারা বাকিতে মালামাল সরবরাহ করেন, হুটহাট অভিযানে দোকানগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় তাদের লাখ লাখ টাকা এক নিমেষে আটকে যায়। হকারের দোকানই যেখানে অস্তিত্বহীন, সেখানে সরবরাহকারী কার কাছ থেকে টাকা তুলবেন? ফলে পাইকারি বিক্রেতারাও রাতারাতি পুঁজি হারিয়ে মারাত্মক সংকটে পড়েন।
দ্বিতীয়ত, ফুটপাতের অর্থনীতি গড়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে, সম্পূর্ণ পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। উচ্ছেদের পর এই পুরো নেটওয়ার্কটি ভেঙে পড়ে। দেনাদার হকার বাস্তুচ্যুত হলে পাওনাদার তার হদিস পান না।
তৃতীয়ত, ধারদেনা বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ঋণ নিয়ে গড়ে তোলা ক্ষুদ্র ব্যবসা চোখের নিমেষে হারিয়ে গিয়ে পরিবারগুলো চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের যে বিপুল জনবল, লজিস্টিকস ও অর্থ এই অভিযানে বারবার ব্যয় হয়, স্থায়ী সমাধান না থাকায় তাও দিনশেষে রাষ্ট্রীয় তহবিলের এক ধরনের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্থায়ী সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি মূল সংকটের সমাধান না করে বরং অননুমোদিত আর্থিক লেনদেনের স্তর পরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রণের হাতবদল করার একটি অদৃশ্য হাতিয়ারে পরিণত হয়। উচ্ছেদ অভিযানের প্রকৃত সফলতা সরকার ও সাধারণ জনগণ কতটা পায়, তা বলা মুশকিল।
মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের এই পরিকল্পনাহীন ও আকস্মিক পদক্ষেপের কারণে অনেক সময় সর্বসাধারণের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা সরকারের মহৎ উদ্দেশ্যগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সমালোচকেরা তখন সুযোগ বুঝে বলতে ছাড়েন না যে, এটি জনগণের প্রতি স্রেফ লোক দেখানো ভালোবাসা। তাদের মতে, এটি এমন একটি উসিলা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া ওপর মহলে স্থানীয় প্রশাসনের ‘সক্রিয়তা’ প্রমাণ করার এটিও একটি সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সব মিলিয়ে চড়া মূল্য দিতে হয় সরকার ও সাধারণ জনগণকেই।
উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ও গতানুগতিক ধারা হলো—ফুটপাত, রাস্তা, সরকারি জায়গা কিংবা নদী বা খালপাড়ের অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর জায়গাগুলো অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই খালি ফেলে রাখা হয়। উচ্ছেদ কার্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে সৌন্দর্যবর্ধন, রাস্তা তৈরি বা সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর কিংবা স্থায়ী কোনো তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। ফলে কয়েক দিন গড়ালেই তা আবার পূর্বের রূপে ফিরে যেতে শুরু করে।
তবে এবার ফিরে আসে নতুন মোড়কে এবং নতুন কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের কর্তৃত্বে বা দখলে। এর ফলে সর্বসাধারণের চিন্তায় এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি অনেক সময় কেবলই একটি সাময়িক উপশম বা ক্ষণস্থায়ী প্রচারণামূলক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। যা মূলত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং কিছু অসহায় মানুষের নীরব কান্নার কারণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এখানে আইনের শাসনের একটি বড় পরীক্ষা দেখা যায়। ফুটপাতের ক্ষুদ্র হকারদের তাড়াতে প্রশাসনিক কড়াকড়ির কোনো অভাব হয় না। অথচ একই রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে যখন ডজন ডজন বাস-ট্রাক অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা হয় কিংবা রিকশার গ্যারেজ তৈরি করা হয়, তখন সেখানে উচ্ছেদ কার্যক্রম কতটা সচল বা চোখে পড়ার মতো? এই প্রশ্ন তখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। মাঠ পর্যায়ের এমন অসংগতির কারণে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়। পথেঘাটে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই এই বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে ও প্রশ্ন রাখতে দেখা যায়।
মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বড় বড় বাস-ট্রাক স্ট্যান্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, সারি সারি বাস-ট্রাক রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে। সন্ধ্যার পর তো পুরো রাস্তাই একপ্রকার বেদখল হয়ে যায়। ফলে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে এবং ঘরমুখী কিংবা রাস্তায় হাঁটতে বের হওয়া সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
কোনো সাধারণ নাগরিক সেখানে স্বস্তিতে হেঁটে পার হতে পারেন না। ফলে মানুষ বিরক্ত হন, প্রশাসনের ওপর দোষ চাপান এবং প্রশ্ন তোলেন—এই ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কোনো স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চোখে পড়ে কি না।
তীব্র যানজটে মানুষের যখন নাভিশ্বাস ওঠে, তখন আমাদের জনবান্ধব সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সত্ত্বেও দিনশেষে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও তদারকির সীমাবদ্ধতার কারণে দায়ভার এসে পড়ে নীতিনির্ধারকদের ওপরই।
ঠিক যেমনটা আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সেখানে প্রভাবশালী আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমি ও প্রাকৃতিক খাল-জলাশয় দখলের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। এই প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে নানামুখী প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো স্থায়ী প্রতিকার বা বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান অনেক সময় দেখা যায় না।
তখন সাধারণ মানুষ ক্ষোভ আর আফসোস নিয়ে ভাবেন—আইনের কঠোরতা কি সবার জন্য সমান নয়?
তবে এ দেশের আপামর জনসাধারণের দৃঢ় বিশ্বাস ও আশা—বর্তমান গণমুখী ও জনবান্ধব সরকার এই বিষয়গুলোতে অত্যন্ত আন্তরিক ও যত্নশীল হবেন। জনগণের আবেগ ও প্রত্যাশার এই সরকার কোনো নির্দিষ্ট মহলের প্রভাবমুক্ত হয়ে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করবেন এবং সর্বস্তরে সমতা প্রতিষ্ঠা করবেন।
ফুটপাত বা সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক কুফল আছে, পথচারীদের ভোগান্তি হয়—তা অস্বীকার করার কোনো জো নেই। তবে সমস্যার সমাধান কেবল বলপ্রয়োগ বা হুটহাট উচ্ছেদ নয়; বরং প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনা।
এ দেশে নগর উন্নয়ন ও হকার পুনর্বাসন সংক্রান্ত কাগজে-কলমে অনেক চমৎকার আইনি নীতিমালা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়—‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। নীতিমালার সেই ‘কিতাবি’ আশ্বাসকে বাস্তবে ‘গোয়ালে’ রূপান্তর করতে স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর সচেতন নাগরিক হিসেবে দরকার নীতিগত পরিবর্তন ও স্থায়ী ব্যবস্থা।
প্রথমত, যেকোনো অভিযানের পূর্বে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। উচ্ছেদের আগে মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করতে হবে। হুটহাট উচ্ছেদ না করে তাদের বিকল্প জায়গায় সরে যাওয়ার জন্য ন্যূনতম হলেও একটি যৌক্তিক সময় এবং এককালীন দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হকারদের ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এনে আধুনিক বিপণন অঞ্চল তৈরি করা আবশ্যক। সুনির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ কিংবা সময়-বণ্টনভিত্তিক বিপণন অঞ্চল করার অনুমতি দিলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গতি পাবে এবং অননুমোদিত প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, পুনরুদ্ধারকৃত জায়গার স্থায়ী অবকাঠামোগত রূপান্তর নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নদী বা খালের পাড় কিংবা রাস্তা-ফুটপাত উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে খালি ফেলে না রেখে পাবলিক পার্ক, হাঁটার পথ, খেলার মাঠ বা সামাজিক বনায়ন করে দেওয়া উচিত, যেন পুনরায় দখলের কোনো সুযোগই না থাকে।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ণ, বিকেন্দ্রীকরণ ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ছিন্নমূল মানুষকে কেবল উচ্ছেদ না করে তাদের জন্য স্থায়ী সামাজিক আবাসন এবং ঢাকার বাইরে নিজ নিজ উপশহরে ক্ষুদ্র ঋণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে শহরমুখী স্রোত অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, হুটহাট উচ্ছেদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; এটি মূল সমস্যার গভীরে না গিয়ে কেবল ওপরের ডালপালা ছাঁটার শামিল। ফুটপাতের একেকটি ক্ষুদ্র দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যে সরবরাহকারী, কারিগর বা পাইকারি বিক্রেতার রুটি-রুজি এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলটি এক ঝটকায় ভেঙে দেওয়া হয়, রাষ্ট্রকে সেই মানবিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূঢ় বাস্তবতার কথা সবার আগে বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমান সরকার যেহেতু সাধারণ মানুষের আবেগ, কষ্ট ও অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে, তাই জনগণের আশা—সরকার কেবল কঠোর ‘উচ্ছেদকারী’র ভূমিকায় না থেকে ‘নিয়ন্ত্রণকারী ও পুনর্বাসনকারী’র দূরদর্শী রূপ ধারণ করবে।
‘কাজীর গরু’র মতো শুধু খাতায়-কলমে আইনি সক্রিয়তা না দেখিয়ে, যেদিন প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকেরা সত্যি সত্যি ‘আইনের শাসনের সমপ্রয়োগ’ নিশ্চিত করতে পারবেন, সেদিনই কেবল রাষ্ট্রীয় তহবিলের অর্থ ও শ্রমের অপচয় বন্ধ হবে।
নিশ্চয়, বর্তমান জনবান্ধব নীতিনির্ধারকদের হাত ধরে ফুটপাত ও রাস্তা যেমন সচল হবে, তেমনি দেশের সাধারণ পথচারী এবং খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ ফিরে পাবে তাদের টেকসই ও কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি—এই আশাবাদ আমাদের সবার।
লেখকঃ অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা