রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ | ৯ কার্তিক, ১৪৩৩ | ১৩ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ৯:৩৩:২৩
শিরোনাম
● অবক্ষয়ের চোরাবালি ও আমাদের সমাজ ● বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন ● ২০২৭ সালের রমজান ও দুই ঈদের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ ● গিয়ারে ত্রুটি: হোন্ডার ৯৪ বাইক প্রত্যাহারের ঘোষণা সৌদির ● অন্যের নামে জমি রেকর্ড হলে নিজের নামে করবেন যেভাবে ● ফের চালু হচ্ছে সেন্টমার্টিন, পর্যটকদের দিতে হবে এবার পরিবেশ ফি ● বিভিন্ন মাদরাসায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে যা বললেন আজহারী ● হুথি হামলায় বন্ধ হওয়ার পর ফের ফ্লাইট চালু করতে প্রস্তুত রিয়াদ বিমানবন্দর ● ক্যাথলিক গির্জায় যৌন নিপীড়ন: ১৩০০ ভুক্তভোগীকে ৮০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ ● ৫৩ বছরেও যেভাবে নিজেকে ফিট রাখেন মালাইকা ● অবক্ষয়ের চোরাবালি ও আমাদের সমাজ ● বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন ● ২০২৭ সালের রমজান ও দুই ঈদের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ ● গিয়ারে ত্রুটি: হোন্ডার ৯৪ বাইক প্রত্যাহারের ঘোষণা সৌদির ● অন্যের নামে জমি রেকর্ড হলে নিজের নামে করবেন যেভাবে ● ফের চালু হচ্ছে সেন্টমার্টিন, পর্যটকদের দিতে হবে এবার পরিবেশ ফি ● বিভিন্ন মাদরাসায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে যা বললেন আজহারী ● হুথি হামলায় বন্ধ হওয়ার পর ফের ফ্লাইট চালু করতে প্রস্তুত রিয়াদ বিমানবন্দর ● ক্যাথলিক গির্জায় যৌন নিপীড়ন: ১৩০০ ভুক্তভোগীকে ৮০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ ● ৫৩ বছরেও যেভাবে নিজেকে ফিট রাখেন মালাইকা

অবক্ষয়ের চোরাবালি ও আমাদের সমাজ

সাবির আমিন রেজা
সাবির আমিন রেজা
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৬
শেয়ার: mail
অবক্ষয়ের চোরাবালি ও আমাদের সমাজ

ছবি: এআই দ্বারা তৈরি (প্রতীকী ছবি)

প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা বিপ্লবে এদেশের সাধারণ মানুষ এক বুক আশা নিয়ে রাজপথে নেমে আসে, আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান নেয়, সর্বাত্মক সমর্থন ও সাপোর্ট দেয়। জনতার এই লৌহকঠিন প্রতিরোধের মুখে একসময় ক্ষমতাসীনেরা পালাতে বাধ্য হয় এবং আন্দোলন চূড়ান্তভাবে সফল হয়। এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনে কিছু বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর স্বৈরাচারী পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে এদেশের সাধারণ মানুষ মনভরে হাততালি দেয়, বাঁধভাঙা আনন্দ-উল্লাস করে ও ভাবে মনে হয়, এবার বুঝি এক নতুন ভোরের উদয় হলো, এবার বুঝি সমাজ থেকে সব অন্যায়-অবিচার এক নিমেষেই বিলীন হয়ে যাবে।

কিন্তু উৎসবের আলো নিভে যাওয়ার পর, ঠিক তার পরের দিন সকালে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ এক গভীর সত্য অনুভব করে। তারা বুঝতে পারে—যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মূল কাঠামোটি রাতারাতি বদলে ফেলা সহজ নয়; অনেক সময় কেবল উপরিভাগের খোলসটাই পরিবর্তিত হয়, কিন্তু ভেতরের গভীর সংকট ও কাঠামোগত সংস্কারের চ্যালেঞ্জগুলো আগের মতোই থেকে যায়। ক্ষমতার এই রূপান্তর আর শাসনব্যবস্থার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তো এদেশের মানুষ ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে ক্ষমতার পালাবদল ও ছদ্মবেশী বণিকদের আধিপত্য বিস্তারের সময় থেকেই দেখে আসছে।

কার্ল মার্কস তাঁর ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে এই ডাচ ও ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের আদিম লুণ্ঠনপ্রবৃত্তি ও শোষণের খোলস বদলানোর যে চিত্র এঁকেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পরবর্তী ছদ্ম-স্বাধীনতায় এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পরবর্তী দীর্ঘ কালখণ্ডে। ক্ষমতার হাতবদল হলেও আমূল সামাজিক বা নৈতিক মুক্তি মেলেনি। এই চরম হাহাকার আর আস্থার সংকট দেখেই হয়তো স্বাধীনতার ঠিক পরপরই প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমান তৈরি করেছিলেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘আবার তোরা মানুষ হ’।

আজ এত বছর পরও সেই একই প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাস আমাদের আকাশে-বাতাসে হাহাকার হয়ে ফিরছে—এই ভূখণ্ডের মানুষ কবে তার আত্মিক ও মানবিক জাগরণ ঘটাবে? সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের এই যে চোরাবালি, তার গ্রাস থেকে আর কবেই বা টেনে তোলা হবে আমাদের এই সামষ্টিক অস্তিত্বকে?

খাদ্য আমাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়, কিন্তু আজ যখন সেই খাদ্যের পাতে বিষের ছড়াছড়ি, তখন বেঁচে থাকাটাই এক চরম আতঙ্ক। ফরমালিনযুক্ত মাছ-মাংস, কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল, মগবাজারের নকল ডিমের কারখানা, কিংবা বাজারজুড়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আমের জুস, নুডলস, সেমাই, ঘি ও ভোজ্যতেলসহ বলতে গেলে প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি খাদ্য ও খাদ্যোপাদান আজ নকল আর ভেজালে সয়লাব। অথচ, গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ বিশ্ব খাদ্য দিবসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. জিয়াউকুন শি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কনফারেন্স হলের বাইরে গিয়ে মাঠ, বাজার ও পরিবারে উদ্ভাবন পৌঁছানোর এবং পুষ্টিকে কেন্দ্রে রাখার তিনটি অগ্রাধিকারভিত্তিক সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি ‘স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ প্রতিবেদনের বরাতে বৈশ্বিক ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতার চিত্র তুলে ধরে একটি বিখ্যাত চাইনিজ উপমা উল্লেখ করেন—“কাউকে একটি মাছ দিলে আপনি তাকে এক বেলার জন্য খাওয়ালেন, কিন্তু তাকে মাছ ধরা শেখালে আপনি তাকে আজীবনের জন্য খাওয়ালেন।” তিনি স্পষ্ট বলেন, যে উদ্ভাবন ক্ষুদ্র চাষির সাধ্যের বাইরে, তা সফল হতে পারে না।

এই অনুষ্ঠানে নীতিনির্ধারকদের প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিনিয়ত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ব্যাপক অভিযান পরিচালনা ও জরিমানার পরও এই মরণযজ্ঞ থামছে কই? তাহলে গলদটা ঠিক কোথায়? মূল সংকটটি আসলে কেবল আইনের প্রয়োগে নয়, বরং আমাদের সামাজিক নৈতিকতার ধস ও নিয়মিত নাগরিক নজরদারির অভাবে। এই পচন রুখতে হলে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।

শুধু খাদ্যই নয়, আমাদের এই মরণযজ্ঞে ওষুধ ও চিকিৎসাব্যবস্থাও জড়িয়ে গেছে নিবিড়ভাবে। মানুষ যখন রোগমুক্তির আশায় হাসপাতালে ছুটে যায়, তখন সেখানেও তার জন্য ওত পেতে থাকে চরম অব্যবস্থাপনা। এই তো সেদিনও দেখা গেল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এক অসহায় মানুষ চিকিৎসার সামান্য একটি টিকিটের জন্য হাহাকার করছেন, কিন্তু দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট পাচ্ছেন না। এর চেয়েও বড় মরণফাঁদ হলো সরকারি হাসপাতালগুলোর ভেতরে চলা ওষুধের হরিলুট; কিছুদিন পূর্বেই টাঙ্গাইলের একটি সরকারি হাসপাতালে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের স্তূপ উদ্ধার হওয়া এর এক জ্যান্ত প্রমাণ। রোগ নিরাময়ের নামে এই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আর চিকিৎসকদের চরম অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় যখন প্রতিনিয়ত রোগীর অকালমৃত্যু ঘটে, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। পূর্ববর্তী আমলগুলো থেকে চলে আসা এই পচে যাওয়া সিস্টেমকে ব্রেক কষে ধরার জন্য বর্তমান সরকারের দূরদর্শী ও কঠোর নজরদারি আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে সামষ্টিক পতন রুখতে হলে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার মতো সৎ ও সবল সাহসের বড্ড অভাব আজ।

শুধু কি খাবারের টেবিল বা ওষুধের বাজার? নিরাপদ নেই আমাদের মাথার ওপরের ছাদটুকুও। একের পর এক বহুতল ভবন, হোটেল কিংবা অফিসে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আর তাতে পুড়ে কয়লা হওয়া মানুষের লাশ প্রমাণ করে—আমাদের আধুনিকতার চাকচিক্যের নিচে লুকিয়ে আছে চরম অব্যবস্থাপনার এক জ্বলন্ত চিতা। নাগরিক সেবার নামে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন এখন এক চরম প্রতারণার ফাঁদ। শখ করে কেনা নামী ব্র্যান্ডের জুতা পায়ে দেওয়ার মাত্র ১ ঘণ্টার মাথায় ছিঁড়ে হাঁ হয়ে যায়! অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে এসি বাসে উঠলে দেখা যায় মাঝপথে গিয়ে এসি হাওয়া, গরমে যাত্রীদের দমবন্ধ অবস্থা। ট্রেনের বিলাসবহুল এসি রুমে চড়লে মাথার ওপর থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে এসির নোংরা পানি গায়ের ওপর পড়ে। অথচ এসব চরম ভোগান্তির কোনো ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার নেই। এমনকি ট্রেনের টিকিট অনলাইনে ছাড়ার যে দিন ঘোষণা করা হয়, ঠিক সেই দিন ও সেই ২/৪ মিনিটেই টিকিট গায়েব হয়ে যায়! মিনিটের মধ্যে সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার এই ডিজিটাল হরিলুট নাগরিকের অধিকারকে প্রতিনিয়ত উপহাস করছে।

পথ চলতে গেলে যে ফুটপাত মানুষের মৌলিক অধিকার, তা আজ অঘোষিত ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং চোরাকারবারীদের অভয়ারণ্য। এই অবৈধ দখলমুক্ত করতে মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘উচ্ছেদ’ নামক এক হাস্যকর নাটক চালানো হয়; কিন্তু দিন শেষে ‘যেই লাউ সেই কদু’—উচ্ছেদ অভিযান শেষ হতে না হতেই ফুটপাত আবার চলে যায় পূর্বের সিন্ডিকেটের দখলে। তার ওপর প্রায়শই দেখা যায় নাগরিক সেবার নামে বছরজুড়ে চলা ফুটপাত কাটাকাটির এক অন্তহীন উৎসব; কিছুদিন পরপরই ভালো ও পুরোনো ইট বা ব্লক সরিয়ে নতুন টাইলস বসানো, আর তার কিছুদিন পরেই আবার কোনো অজুহাতে তা ভেঙে রাস্তা ও ফুটপাতকে চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য করে তোলার যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তা জনগণের প্রাত্যহিক ভোগান্তিকে চরম সীমায় নিয়ে ঠেকেছে। গলির মোড়ে মোড়ে মাদকের থাবা আর কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সাধারণ নাগরিকের।

সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন কোনো অঙ্গ বাকি নেই, যা এই ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত। অফিস-আদালতে ফাইল নাড়াতে গেলে ঘুষ এখন এক অলিখিত নিয়ম, আর গায়ের জোরে ভূমি জবরদখল তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নির্মাণ খাতেও চলছে চরম অনৈতিকতা; রডের পরিবর্তে বাঁশ আর সিমেন্টের পরিবর্তে স্রেফ বালু ব্যবহার করে মানুষের আবাসনকে বানানো হচ্ছে সাক্ষাৎ যমপুরী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অবক্ষয়ের ছায়া পড়েছে; শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতি আর কিশোরদের বিপথগামিতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মানুষের ভেতরের পারস্পরিক সম্পর্ক ও নৈতিকতার অবক্ষয়। কর্মক্ষেত্রে এক সহকর্মী আরেক সহকর্মীকে টেনে নিচে নামাতে ব্যস্ত। সমাজে একজন অন্যজনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ক্ষমতার লোভ আর দলীয় কোন্দলে আমরা ভুলে গেছি পারস্পরিক সৌহার্দ্য। এই মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় এখন আমাদের অন্দরেও হানা দিয়েছে—খুব তুচ্ছ বা সামান্য কারণে স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কে চিড় ধরছে, তৈরি হচ্ছে চিরস্থায়ী বিভেদ। বাইরে চলছে প্রযুক্তির অপব্যবহার; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ফেসবুকে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর মাধ্যমে একজন অন্যজনকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে লিপ্ত। সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি হচ্ছে আমাদের শিশুদের ও নারীদের ওপর। শিশু বলাৎকার এবং নারী ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা এখন প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতা দখল করে রেখেছে। অপরাধীদের এই দুঃসাহসের মূল কারণ একটাই—আমাদের দেশে কাগজের পাতায় আইনের স্তূপ আছে, কিন্তু তার প্রকৃত কোনো প্রয়োগ নেই। ‘জোর যার মুল্লুক তার’—এই মধ্যযুগীয় বর্বর নীতিই যেন আজ আধুনিক সমাজের অলিখিত সংবিধানে পরিণত হয়েছে।

এই সামগ্রিক নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার চরম অবমূল্যায়ন। অতীতে দেখা গেছে, যেকোনো পদ বা পদবি পাওয়ার প্রধানতম যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজনৈতিক ‘সার্টিফিকেট’। মেধা, সততা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এখানে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিধিবিধান ও নিয়মনীতি ঠিকই বিদ্যমান, কিন্তু দীর্ঘদিনের চাটুকারিতার সংস্কৃতির কারণে সেগুলোর কোনো তোয়াক্কা ছিল না। পূর্ববর্তী আমলগুলোর নোংরা ঐতিহ্য ধরে রেখে একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী ও অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্লাস করা কিংবা অফিস করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। অথচ মাসের শেষে বেতন, বোনাস কিংবা বৈষয়িক ভোগের সময় ঠিকই সবচেয়ে বড় ভাগটি তাঁদের সবার আগে চাই। বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দলীয়করণ আর চাটুকার সিন্ডিকেটকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা।

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কাঠামোর শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা যখন একবার কোনো চেয়ার বা পদবিতে বসেন, তখন তাঁরা যেকোনো মূল্যে সেই কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চান। চেয়ার হারানোর ভয়ে তাঁরা নীতি, নৈতিকতা ও সততাকে অনায়াসে বিসর্জন দিয়ে দেন। সেই চেয়ার টিকিয়ে রাখার অপকৌশলটি আইনসম্মত হোক বা না হোক, সংবিধানে তার সুনির্দিষ্ট কোনো বৈধতা থাকুক বা না থাকুক, কিংবা চাকরির মেয়াদ বা নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাক—তাতে মোটেও কিছু আসে যায় না। আইন ও বিধিবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ক্ষমতার জোর খাটানো বা পেছনের দরজা দিয়ে অবৈধ সুবিধা নিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ চেয়ার আঁকড়ে থাকার এই যে তীব্র লোভ, তা পুরো প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে কলুষিত করে তুলছে, যা সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দ্বিমুখী আচরণ বা ভণ্ডামি। আমরা মুখে কোরআন মানি, ধর্ম মানি, বড় বড় জিলিপি-প্যাঁচানো নীতির কথা বলি; কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে অপর মানুষের হক, এমনকি নিজের রক্তের ভাই-বোনের ন্যায্য পাওনা অবলীলায় মেরে দিই। আমাদের সমাজে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত কিংবা ধর্মীয় শাস্ত্রের সুগভীর পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও একাংশের মানুষের মধ্যে অনৈতিক কাজের প্রবণতা প্রকট। তাঁরা মুখে ধর্মের বুলি আওড়ালেও ভাইয়ের পাওনা টাকা বা বোনের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ কায়দা করে আত্মসাৎ করতে দ্বিধা করেন না। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, মানুষের মৃত্যুর পর তার ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি সব এ পৃথিবীতেই রয়ে যায়, কেবল তিনটি জিনিস—সদকায়ে জারিয়া, দ্বীনি জ্ঞান এবং নেক সন্তান—তার সঙ্গে কবরে যায়। তবুও আমরা এই চরম সত্যটি ভুলে গিয়ে অন্যের হক নষ্ট করি, অবৈধ সম্পদ ভোগ করি ও জোরপূর্বক জমি দখল করি।

বৃদ্ধ বাবা-মাকে দুমুঠো অন্ন খাওয়াতে আমাদের গায়ে জ্বর আসে, অথচ লোকদেখানো সামাজিক বাহবা কুড়াতে মসজিদে বা মাদ্রাসায় লাখ টাকা দান করি। ইসলামে গোপন দানকে সর্বোত্তম বলা হলেও, আমাদের সমাজব্যবস্থা আজ এক কুৎসিত প্রদর্শনীতে মত্ত। মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজে খতিব বা ইমাম সাহেবরা দানের পরিমাণের ওপর ভর করে মাইকে চিৎকার করে করে দাতাদের নাম ও টাকার অঙ্ক ঘোষণা করেন। যার দান যত বেশি, তার নাম তত জোরে এবং বিশেষ সম্মানের সঙ্গে উচ্চস্বরে প্রচার করা হয়, যা ইবাদতের মূল আধ্যাত্মিকতা ও লোকচক্ষুর অন্তরালে ত্যাগের মহিমাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে বছরের পর বছর মানুষের পাওনা ঋণ বা দায় পরিশোধ না করে, ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে আমরা দলে দলে গিয়ে পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করে আসছি। ধর্মের এই বাহ্যিক খোলস আজ আমাদের ভেতরের কুৎসিত চরিত্রকে আড়াল করার সস্তা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি একশ্রেণির হুজুর যখন পরনারী নিয়ে ব্যভিচার করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন, তখন নিজেদের পক্ষে একাধিক বিয়ের সাফাই গেয়ে সমাজকে বিভ্রান্ত করতে চান।

৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান দেশবাসীকে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু আজ খুব আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হয়, এই স্বাধীন পরিবেশ উপহার দেওয়ার পাশাপাশি তা আমাদের সমাজকে এক অদ্ভুত ও বিকৃত উগ্র ‘নতুন সংস্কৃতি’র মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা যায় ‘হাইপার-পপুলিজম’ বা উগ্র জনতুষ্টিবাদ, যেখানে জনতা নিজেই নিজের আইন তৈরি করতে চায়। আমরা এখন মুক্তির উল্লাসে অন্ধ হয়ে সবকিছুর ওপর কুঠারাঘাত করছি। আজ আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি, তাঁর ছবিতে মুখে কালি লেপন করছি। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরাচ্ছি। ইতিহাসের এই নির্মমতার চক্র তো এখানেই থামবে না; হয়তো আর কয়েক দিন পর কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়েও প্রশ্ন তোলা হবে, আবার কোনো পক্ষের দ্বারা অন্যদের গলায় জুতা দেওয়া হবে। ক্ষমতার পালাবদলে আজ আমরা উল্লাসে শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি ভাঙলাম, ঠিক একই প্রতিশোধের আগুনে হয়তো আগামীকাল আবার কোনো ক্ষুব্ধ পক্ষ রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্মৃতিস্তম্ভ বা মূর্তিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। সমাজবিজ্ঞানের ‘সাইকেল অব রিভেঞ্জ’ বা প্রতিশোধের চক্রের এই অন্তহীন হিংসার রাজনীতিতে আমরা কেবল জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেই লাঞ্ছিত করছি না, ব্যক্তিমানুষ হিসেবে নিজেদের মেরুদণ্ডকেও ভেঙে ফেলছি।

এই নতুন সংস্কৃতির নামে এখন চারদিকে চলছে মব জাস্টিস আর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মহোৎসবে ত্রাসের রাজত্ব। তুচ্ছ অজুহাতে একদল মানুষ হুট করে অন্যের অফিস ভাঙচুর করছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করে এক নারকীয় পরিবেশ বা মরণফাঁদ তৈরি করছে। জনমনস্তত্ত্ব বা সোশ্যাল সাইকোলজির এই চরম ধস শুধু রাজপথ বা অফিসে নয়, ঢুকে পড়েছে আমাদের শোবার ঘরেও। সহনশীলতা ও ধৈর্য লোপ পাওয়ায় আজ অতি তুচ্ছ কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গভীর বিভেদ তৈরি হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে সাজানো সংসার। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রযুক্তির অভিশাপ। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেসবুকে কুৎসিত প্রোপাগান্ডা ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে একজন সম্মানিত মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। মানুষ এখন আর যুক্তিতে বিশ্বাস করে না, বরং ভার্চুয়াল আদালতের মব মেন্টালিটিতে অন্যকে ধ্বংস করতে প্রমোদ খোঁজে।

এই সিস্টেমের নৈতিক পচন যখন কাঠামোগত রূপ নেয়, তখন তা প্রকাশ পায় আমাদের অবকাঠামো ও নীতিনির্ধারণে। সমাজবিজ্ঞানী ইমিল ডুর্খেইমের ‘অ্যানোমি’ বা নিয়মহীনতার তত্ত্ব আজ আমাদের সমাজ ও নির্মাণশিল্পে স্পষ্ট। বেশি মুনাফা লোটার লালসায় একশ্রেণির ঠিকাদার ও প্রকৌশলী ভবন বা সেতু নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করছে, আর সিমেন্টের পরিবর্তে স্রেফ বালু মিশিয়ে দিচ্ছে। এটি কেবল দুর্নীতি নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। অন্যদিকে, এই নৈরাজ্য থামাতে যেখানে রাষ্ট্রের দূরদর্শী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেখানে আমরা দেখছি আমলাতান্ত্রিক অদূরদর্শিতা। আয়করে ‘মূলধনী গেইন’ বা কর আরোপের নামে অতীতে সংঘটিত জমি বা বাড়ি বিক্রয়ের ওপর নতুন করে গেইন ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। অতীতে বিক্রয় সম্পন্ন হওয়া সম্পত্তির ওপর পেছনের তারিখ থেকে এই কর বসিয়ে মানুষকে চরম হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, নীতিনির্ধারকদের এমন হুটহাট করে নেওয়া অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত জনকল্যাণের মূল ধারায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটি কেবল আমলাতান্ত্রিক সুবিধাবাদী ও চাটুকারদের স্বার্থরক্ষা করে, সাধারণ নাগরিকদের নয়। এই নীতি যদি আনতেই হতো, তবে তা পরবর্তী অর্থবছর থেকে নতুন করে চালু করা যেত। তাছাড়া গেইন ট্যাক্স সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন বা ক্রয়-বিক্রয়ের সময়ই এককালীন কেটে নেওয়া সবচেয়ে উত্তম ও ঝামেলাহীন কাজ, যা অতীতেও ছিল। রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি ও তার বাস্তবায়ন সব সময় গঠনমূলক হওয়া জরুরি। সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা হলে তার জবাবে জেল-জুলুম বা আইনি খড়্গ চালানো সুশাসনের লক্ষণ নয়; বরং গঠনমূলক সমালোচনাকে গ্রহণ করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা মানুষদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করা দরকার। তবেই রাষ্ট্রে প্রকৃত সুশাসন ও জবাবদিহিতা আসবে।

শিক্ষার মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে আমাদের পরীক্ষা ও মূল্যায়নব্যবস্থার এক চরম ন্যক্কারজনক সংস্কৃতি। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানে যুগ যুগ ধরে এক ধরনের দায়সারা জালিয়াতি চলে আসছে। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকসমাজের একাংশের ভূমিকা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক শিক্ষক নিজের আলস্য ও অপেশাদারত্বের কারণে পরীক্ষার খাতা নিজে মূল্যায়ন না করে তা ঘরের সন্তান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো জুনিয়র শিক্ষার্থীকে দিয়ে মূল্যায়ন করাচ্ছেন! খাতা মূল্যায়নে, প্রশ্নপত্র তৈরিতে কিংবা মডারেশনে বিশ্ববিদ্যালয় বা বোর্ডের পক্ষ থেকে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তারা আদৌ সেই সুনির্দিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী কি না, কিংবা তারা ক্লাসে সেই বিষয়গুলো নিয়মিত পড়ান কি না—তা ন্যূনতম বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে; শিক্ষকরা মূল পাঠ্যবই বাদ দিয়ে সস্তা বাজারচলতি গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন এবং খাতা না পড়েই গড়ে নম্বর বসিয়ে দিচ্ছেন। মূল্যায়নের এই তামাশা ও মনগড়া নানা কাহিনির কারণে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে আর অযোগ্যরা মেধার সার্টিফিকেট নিয়ে ওপরে উঠছে। ম্যাক্স ভেবারের ‘র্যাশনাল-একাডেমিক ব্যুরোক্রেসি’ বা যৌক্তিক শিক্ষাতত্ত্ব অনুযায়ী, মূল্যায়নের এই প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতি একটি জাতির মেধাগত ভিত্তিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা এই প্রাতিষ্ঠানিক পাপের প্রতিকার আসলে কে করবে?

এই সামগ্রিক সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও মনস্তাত্ত্বিক বলি হয়েছেন আমাদের মানুষ গড়ার কারিগর এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণে আজকের ক্লাসরুমগুলোতে শিক্ষকেরা যেন এক একজন ‘অসুস্থ সিংহ’। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত কোর্সসমূহে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে অনুপস্থিতি এখন এক সাধারণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তবে এই দূরত্বের পেছনে কোনো ঢালাও অবহেলা নয়, বরং লুকিয়ে আছে এক রূঢ় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা; বর্তমান যুগে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের টিকে থাকার লড়াইয়ে এবং পরিবারের হাল ধরতে এই শিক্ষার্থীদের এক বিশাল অংশকে প্রাত্যহিক কোনো না কোনো চাকরি বা কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকতে হয়, যা তাদের ক্লাসে আসার নিয়মিত সুযোগকে সীমিত করে দিচ্ছে।

এর পাশাপাশি, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখনো ক্যাম্পাস ও তরুণ মানসে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে, যার রেশ ধরে প্রায়শই অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা ঘটছে। যুগের পরিবর্তনে আজ তরুণ প্রজন্ম নিজেদের অধিকার ও মতপ্রকাশে অনেক বেশি সোচ্চার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, পারস্পরিক আস্থার সংকটের জেরে শিক্ষকেরা আজ ক্লাসরুম থেকে শুরু করে সর্বত্র এক অলিখিত ভীতি ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন। কখন কোন প্রশাসনিক বা একাডেমিক অসন্তোষের জেরে কথোপকথন গোপনে মুঠোফোনে রেকর্ড করে ফেসবুকে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে বিতর্কিত করা হবে—এই একবিংশ শতাব্দীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এর ফলে ক্লাসরুমের সেই চিরন্তন স্নেহ ও শাসনের আত্মিক সম্পর্কটি আজ স্রেফ ইজ্জত ও আত্মসম্মান রক্ষার এক আপসের নীতিতে রূপ নিয়েছে। সামান্য মতভিন্নতা হলেই শিক্ষকদের কপালে রাজনৈতিক বা আদর্শিক ‘ট্যাগ’ লাগানো, কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষকদের প্রশাসনিক চাপ দিয়ে চেয়ার থেকে নামানোর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টোটাল কলাপ্স অব ইনস্টিটিউশনাল চেইন অব কমান্ড’ বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চরম বিপর্যয়। যে সমাজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্নেহ ও ইনসাফের বুনিয়াদি সম্পর্কটি পদদলিত হয় এবং গুরুরা এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতিতে মাথা নিচু করে চলতে বাধ্য হন, সেই সমাজের ভবিষ্যৎ যে কত বড় অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে, তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

এই চরম নৈতিক ধসের সমান্তরালে চলছে একশ্রেণির উচ্চশিক্ষিত ও ক্ষমতাশালীর লালসার উৎসব। কার্ল মার্কস তাঁর জগদ্বিখ্যাত ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে পুঁজির আদিম ও আগ্রাসী চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্পষ্ট করেছিলেন যে, শোষক শ্রেণি কীভাবে নিজের বৈষয়িক ও শারীরিক স্বার্থে অন্য মানুষের শ্রম ও অস্তিত্বকে স্রেফ পণ্যে রূপান্তরিত করে। আজ আমাদের সমাজেও পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মাউনের সেই হুঁশিয়ারিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, যে যত বড় ধর্মীয় পণ্ডিত বা উচ্চশিক্ষিত, তাঁদের একাংশের নৈতিক স্খলন ততটাই সুগভীর ও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চাকরি স্থায়ী করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বা অফিসের পার্টটাইম সহকর্মী নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হচ্ছে। কোনো দরিদ্র বা অসহায় কিশোরীকে সামান্য একটি জীবিকা দেওয়ার নাম করে তার চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার সঙ্গে পৈশাচিক লালসা চরিতার্থ করা হচ্ছে। কিশোরী বা অধীনস্থদের ওপর ক্ষমতার এই অপব্যবহার মার্কসীয় দর্শনে যেমন পুঁজি ও ক্ষমতার চরম শোষক রূপ, তেমনি মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এটি এক মারাত্মক ‘সাইকোপ্যাথিক’ বা বিকৃত ও শোষক মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। আমরা বাইরে সাধু সেজে অন্য দেশের আর অন্য ধর্মের মানুষের সমালোচনা করি, কিন্তু নিজেরা কতটা দায়িত্বহীন আর কামাসক্ত নরপশুতে পরিণত হয়েছি—তা নিজেরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছি।

আমরা এমন এক চোরাবালিতে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে প্রতিদিন আমাদের নৈতিকতার মৃত্যু হচ্ছে, আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এবং মানুষ হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিনিয়ত পদদলিত হচ্ছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ‘দাস ক্যাপিটাল’-এ বর্ণিত সেই আদিম লুণ্ঠন ও শোষণের আধুনিক রূপকে যদি রুখতে না পারা যায়, তবে একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, “পৃথিবীটা বাস করার জন্য বিপজ্জনক জায়গা হয়ে উঠছে খারাপ মানুষের অন্যায়ের কারণে নয়, বরং ভালো মানুষেরা যারা অন্যায় দেখেও চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকে তাদের জন্য।”

আজকের এই নতুন বাংলাদেশে যদি আমরা সত্যি একটি বৈপ্লবিক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন চাই, তবে শুধু ক্ষমতার চাকা বা বোতলের লেবেল ঘোরালেই চলবে না; আমাদের পচে যাওয়া মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক লোভের আমূল সংস্কার করতে হবে। বর্তমান তারেক রহমানের সরকারের সামনে এখন দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি ছাত্র ও জনতার নামে চলা এই বিশৃঙ্খলা, শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন, সর্বস্তরে ঘুষ-দুর্নীতি, দায়সারা শিক্ষানীতি, অদূরদর্শী ও অযৌক্তিক ট্যাক্স নীতি আর সংস্কৃতির নামে উগ্রতা বন্ধ করা না যায়, তবে কোনো সংস্কারই আলোর মুখ দেখবে না। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া এবং মেয়াদ শেষের পর অনৈতিকভাবে চেয়ার আঁকড়ে থাকার নোংরা সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে যে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব বোর্ডের মতো নীতিনির্ধারণী সংস্থাকে সাধারণ মানুষের ওপর হয়রানিমূলক নীতি চাপানো বন্ধ করতে হবে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গাইড বই ও ত্রুটিপূর্ণ খাতা মূল্যায়নপদ্ধতির ওপর শক্ত ব্রেক কষতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আপামর জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধর্মীয় লৌকিকতা ও বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চমকপ্রদ খোলস ছেড়ে আমাদের হৃদয়ে প্রকৃত সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ‘হাক্কুল ইবাদ’ বা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুবাতাস ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায়, বোতল বদলের এই অন্তহীন চোরাবালি থেকে আমাদের কারোরই কোনোদিন নিস্তার নেই।

 

লেখক: অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

অবক্ষয়ের চোরাবালি ও আমাদের সমাজ

বিস্তারিত কমেন্টে