সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ | ৩ কার্তিক, ১৪৩৩ | ৭ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | দুপুর ১২:৩১:২০
শিরোনাম
● প্রবাসী কর্মীদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তির আবেদন শুরু ২৫ অক্টোবর ● প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩ ইস্যুতে জোর দেবে বাংলাদেশ ● টানা ৮ দিন বন্ধ রিয়াদের বিমানবন্দর, সৌদির নাজরানে বিস্ফোরণের শব্দ ● ‘ইরানের মিসাইলের বাবা নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত’ ● বাংলাদেশিদের জন্য বড় সুখবর দিল জাপান ● ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন ও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ● সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ● বাংলাদেশের পূজা দেখে সন্তুষ্ট ভারতীয় হাইকমিশনার ● গাজীপুরে পৃথক দুই স্থানে ঝুটের গোডাউনে আগুন ● চুয়াডাঙ্গায় আড়াই বছরেও শেষ হয়নি বড়পুটিমারি গ্রামের ব্রিজের নির্মাণ কাজ, দুর্ভোগ চরমে ● প্রবাসী কর্মীদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তির আবেদন শুরু ২৫ অক্টোবর ● প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ৩ ইস্যুতে জোর দেবে বাংলাদেশ ● টানা ৮ দিন বন্ধ রিয়াদের বিমানবন্দর, সৌদির নাজরানে বিস্ফোরণের শব্দ ● ‘ইরানের মিসাইলের বাবা নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত’ ● বাংলাদেশিদের জন্য বড় সুখবর দিল জাপান ● ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন ও জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ● সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ● বাংলাদেশের পূজা দেখে সন্তুষ্ট ভারতীয় হাইকমিশনার ● গাজীপুরে পৃথক দুই স্থানে ঝুটের গোডাউনে আগুন ● চুয়াডাঙ্গায় আড়াই বছরেও শেষ হয়নি বড়পুটিমারি গ্রামের ব্রিজের নির্মাণ কাজ, দুর্ভোগ চরমে

তিল থেকে তাল: তুচ্ছ অহংকারে যখন ভাঙছে সংসার

সাবির আমিন রেজা
সাবির আমিন রেজা
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৮
শেয়ার: mail
তিল থেকে তাল: তুচ্ছ অহংকারে যখন ভাঙছে সংসার

ছবি: এআই দ্বারা তৈরি (প্রতীকী ছবি)

মানুষ জন্ম নেয় একা, পরে প্রকৃতির নিয়মে গড়ে তোলে সংসার। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরিবার হলো সমাজের আদিমতম ও মৌলিক একক, যা একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বর্তমান আধুনিক সমাজে এই পবিত্র বন্ধনটি এক অদৃশ্য ও ভঙ্গুর সংকটের মুখোমুখি। মনোবিজ্ঞানের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, আধুনিক দাম্পত্যে বড় কোনো সংকটের চেয়ে নিত্যদিনের অতি ক্ষুদ্র, সারশূন্য এবং তুচ্ছ ঘটনাগুলোই অহংকার ও জেদের ইন্ধনে ডালপালা মেলে ধ্বংস করে দিচ্ছে একটি সাজানো সংসার।

অথচ পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআন ও হাদিসের বাণী দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার যে নির্দেশনা দেয়, তা আজ আমাদের সমাজে অনুপস্থিত। ইসলামে যেমন যৌক্তিক কারণে বিচ্ছেদ জায়েজ করা হয়েছে, তেমনি বিদায় হজের খুতবায় রাসুল (সা.) নারীদের প্রতি সদয় আচরণ এবং স্ত্রীদেরও স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধার এক চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সনাতন ধর্মে বিয়েকে কেবল চুক্তি নয়, বরং ‘সাত জন্মের আত্মিক বন্ধন’ এবং বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মে একে শান্তি ও ক্ষমার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। দাম্পত্যের এই জটিল মনস্তত্ত্ব, একপেশে অধিকারবোধ এবং তার ফলে সমাজ ও পরিবারে নেমে আসা অমঙ্গলের চিত্রটি আজ গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

সংসার আর রান্নাঘরের গল্পটা কিন্তু খুব বেশি আলাদা নয়। রান্নায় যেমন নুন-ঝাল-টক-মিষ্টির সঠিক অনুপাত একটি পদকে সুস্বাদু করে তোলে, তেমনি দাম্পত্যজীবনও এই বিভিন্ন স্বাদের এক জটিল মিশ্রণ। রাগ-ক্ষোভের ‘ঝাল’, অভিমান ও ভুল বোঝাবুঝির ‘টক’, আর ভালোবাসা ও প্রশংসার ‘মিষ্টি’—এই সব কটি উপাদান মিলেই তৈরি হয় একটি পরিবার। লোকগাথার চিরন্তন জুটি রহিম-রূপবানের গল্পে যেমন বারো বছরের বনবাসের চরম প্রতিকূলতার মাঝেও রূপবানের প্রশ্নাতীত ত্যাগ ও মানিয়ে নেওয়ার এক পরম দৃষ্টান্ত দেখা যায়, তেমনি বৈশ্বিক ইতিহাসের দিকে তাকালে সম্পর্কের অন্য এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো এবং দিয়েগো রিভেরার দাম্পত্যজীবন ছিল তীব্র ক্ষোভের ‘ঝাল’ আর চরম অপমানের ‘টক’-এ ভরা। পারস্পরিক বহু ভুল বোঝাবুঝি, পরকীয়া এবং বিচ্ছেদের পরেও দিনশেষে তাঁরা মানিয়ে নিয়েছিলেন এবং একে অপরের কাছেই ফিরে এসেছিলেন, কারণ তাঁদের আত্মিক টানটি ছিল অবিচ্ছেদ্য। আবার বিশ্বখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয় এবং সোফিয়া টলস্টয়ের দীর্ঘ ৪৮ বছরের সংসারজীবন ছিল চরম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর বৈপরীত্যের এক জটিল আবর্ত। আদর্শগত অমিল আর প্রাত্যহিক অশান্তির ‘ঝাল’ থাকা সত্ত্বেও কেবল একে অপরকে সহ্য করা এবং পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত এক শক্তির ওপর ভর করেই তাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দিয়েছিলেন।

কোনো একটি উপাদানের কমতি বা আধিক্য যেমন খাবারের স্বাদ নষ্ট করে, ঠিক তেমনি সম্পর্কের এই আবেগ ও বাস্তবতার ভারসাম্যহীনতা সংসারে ডেকে আনে অশান্তির কালো মেঘ। পারফেক্ট কোনো মানুষ যেমন হয় না, তেমনি পারফেক্ট কোনো সম্পর্কও আকাশ থেকে পড়ে না। তিলসমতুল্য ভুলগুলোকে বড় না করে, এই বৈচিত্র্যময় জীবনের স্বাদের ভারসাম্য বজায় রেখে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলাই দাম্পত্যের আসল সৌন্দর্য। বিয়ের পূর্বে, তথা যখন প্রেম চলে, তখন মোহ ও আবেগের এক অদ্ভুত জোয়ার থাকে। সকাল-বিকেল দেখা না হলে বা একে অপরের সঙ্গে কথা না বললে জীবন বিষাদময় ও অসার মনে হয়।

প্রেমের এই তীব্র অন্ধত্বের উদাহরণ দিতে গিয়ে ইতিহাসে দেখা যায়—মজনু প্রেমের ঘোরে লাইলির বাড়ির কুকুরকেও চুমু খেয়েছিল, কিংবা শিরি-ফরহাদ একে অপরের জন্য পাহাড় কেটে নদী বইয়ে দিতেও প্রস্তুত ছিল। এমনকি সনাতন পুরাণে রাধাকৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমের আকুলতা কিংবা বাংলা সাহিত্যে দেবদাস ও পার্বতীর সেই তীব্র অনুরাগ যুগ যুগ ধরে প্রেমের মোহের প্রতীক হয়ে আছে। বর্তমান যুগেও এই প্রেমের টানে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের জন্মদাতা মা-বাবাকে ত্যাজ্য করতে বা তাঁদের পরিচয় দিতেও অস্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিয়ের পর সেই আকাশচুম্বী ভালোবাসা যেন অনেকের ক্ষেত্রেই নিমেষেই লাটে ওঠে। বিয়ের পর যখন প্রতিদিনের বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও অভ্যাসের মুখোমুখি হতে হয়, তখন সেই কৃত্রিম রোমান্টিকতা কেটে যায়।

শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ গল্পে যেমন অহংকার আর জেদের কারণে দেবদাস ও পারুর জীবনে ট্র্যাজিক বিচ্ছেদ নেমে এসেছিল, তেমনি আধুনিক সংসারেও অনমনীয় আমিত্বের যুদ্ধ সম্পর্ককে ধ্বংস করে। যে মানুষটির সামান্য কথা না বলা একসময় জীবনকে অসার করে দিত, বিয়ের পর তার ভেজা তোয়ালে বিছানায় রাখা বা তরকারিতে নুন কম হওয়ার মতো অতি তুচ্ছ ‘তিলসমতুল্য’ ভুলগুলোই অহংকার ও জেদের ইন্ধনে বিশাল ‘তাল’ হয়ে দাঁড়ায়। যখনই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ‘ব্যাটে-বলে’ হয় না, তখনই তীব্র অহংবোধের লড়াই শুরু হয়—“আমি কেন ছাড় দেব?” এই আমিত্বের লড়াই যখন বিচ্ছেদের রূপ নেয়, তখন মা-বাবাকে ছেড়ে আসা সেই সন্তানরা অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে বলতে বাধ্য হয়—“মা-বাবা, আমি ভুল করেছিলাম।” তুচ্ছ জেদ আর অহংকারের কারণে সম্পর্কের এই চরম ব্যর্থতা ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত তরুণ-তরুণীরা আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী পথও বেছে নেয়। মোহের অবসান এবং তিলকে তাল বানানোর এই আত্মঘাতী অহংবোধের কারণেই আজ বিয়ের আগের তথাকথিত গভীর প্রেম বিয়ের পরে অতি দ্রুত বিচ্ছেদে রূপ নেয়।

আজকাল অনেক সংসারে দেখা যায়, ঝগড়াগুলো শুরু হয় একদম সারশূন্য ও ক্ষুদ্র বিষয়কে কেন্দ্র করে। প্রতিদিনের চেনা রুটিনে—কে মশারি খাটাল আর কে খাটাল না, সন্তানকে কে স্কুলে নিয়ে যাবে আর কে আনবে, ছুটির দিনে বাজার কে করবে—এই ধরনের অতি সাধারণ বিষয় নিয়ে অহংবোধ বা অনমনীয় আমিত্বের লড়াই শুরু হয়। তরকারিতে নুন কম হওয়া কিংবা “তোমার মায়ের হাতের রান্নার মতো স্বাদ হয় না কেন”—এমন সামান্য মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অহংকারের লড়াই শুরু হয়। ছুটির দিনে স্বামী ঘরে বসে বিশ্রাম নিতে চাইলে আর স্ত্রী বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জিদ ধরলে, এই পছন্দ-অপছন্দের অমিলকে ‘স্বামী বা স্ত্রী আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না’ ভেবে বড় ধরনের অশান্তি তৈরি করা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটল আরও মারাত্মক রূপ নেয়, যখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় তীব্র সন্দেহ আর অমূলক অধিকারবোধ। স্বামীর কোনো মহিলা সহকর্মী অফিসের প্রয়োজনে ফোন করলে “কেন করল?”, কিংবা কোনো পেশাগত কারণে তাকে সামান্য সাহায্য করলে “কেন করা হলো?”—তা নিয়ে শুরু হয় অন্তহীন জেরা।

এমনকি স্বামীর শিক্ষাজীবনের কোনো পুরোনো বান্ধবীর সঙ্গে পথে-ঘাটে হঠাৎ দেখা হলে কিংবা সৌজন্যমূলক সামান্য চা-চক্র হলে সম্পর্কের শান্ত ঘিয়ে যেন তীব্র সন্দেহের আগুন ধরে যায়। এই অমূলক সন্দেহের বিষাক্ত থাবা নিজের পরিবারের লোকজনকেও রেহাই দেয় না; খোদ স্ত্রীর আপন বোন কিংবা ভাবির সঙ্গে স্বামী কোনো সাধারণ আড্ডা দিলে কিংবা সৌজন্যবশত কিছু কিনে দিলেও সেখানেও পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্কের গন্ধ খোঁজা শুরু হয়। এই ধরনের অনাবশ্যক জবাবদিহি ও অবিশ্বাসের দমবন্ধ পরিবেশ থেকে বাঁচতে মানুষ তখন সংসারেও মিথ্যা বলা শুরু করে। নিজের জমানো টাকা দিয়ে কোনো জিনিস কিনলেও জেরার মুখে পড়ার ভয়ে দাম লুকিয়ে রাখা বা তথ্য গোপন করার মতো মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ধরা পড়লে সম্পর্কের বিশ্বাসের ভিত পুরোপুরি নড়ে যায়। মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যখন এই ছোট ছোট ইস্যুতে বিস্ফোরিত হয়, তখন সামান্য ‘তিল’ বিশাল ‘তাল’ হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের যুগে এই দ্বিমুখী নীতি বা দ্বৈত আচরণকে আরও উসকে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল দূরত্ব এবং একে অপরের প্রতি চরম অবিশ্বাস। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের যুগে ইনবক্স লুকিয়ে চেক করা এবং লাইক-কমেন্ট নিয়ে গভীর সন্দেহ করা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বাস ও ভালোবাসার পবিত্র ঘরটি তখন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে ছায়ার মতো চলে স্বামীর পেছনে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দাগিরি। অন্যদিকে, ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে থাকা ‘নিখুঁত সুখী কাপল’-দের কৃত্রিম হাসির সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করে মানুষ একধরনের হীনম্মন্যতায় ভুগছে, যা ঘরের শান্তি পুরোপুরি গ্রাস করে নিচ্ছে। বিজ্ঞানের মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত যে, এই ধরনের আবেগীয় ব্ল্যাকমেইল, দ্বিমুখী আচরণ কিংবা সার্বক্ষণিক গোয়েন্দাগিরি ও তীব্র জবাবদিহি মানুষের মস্তিষ্কে কর্টিসলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা সুস্থ সম্পর্কের প্রধান অন্তরায়।

দাম্পত্যের রসায়নে অধিকারবোধ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তা যখন একপেশে জবাবদিহিতে রূপ নেয়, তখনই সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে। অনেক সংসারে দেখা যায়, স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে একজন অন্যজন কার সঙ্গে কথা বলছেন বা কোথায় যাচ্ছেন—তা নিয়ে যতটা সজাগ ও কঠোর, নিজের বেলায় ঠিক ততটাই উদাসীন। বিশেষ করে অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীই এখানে অলিখিত ‘বসের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। অফিসের বসের নির্দেশ সামান্য এদিক-সেদিক হলে যেমন চাকরি বা পদোন্নতি ঝুঁকির মুখে পড়ে, সংসারে স্বামীর অবস্থাও ঠিক তেমন দাঁড়ায়। অফিস কামাই করতে যেমন বসের পূর্বানুমতির দরকার হয়, ঠিক তেমনি সংসারেও যেকোনো কাজ করতে, নিজের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে কিংবা কোথাও যেতে স্ত্রীর অলিখিত অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। দিনশেষে স্বামীকে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ের কৈফিয়ত দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়, অথচ স্বামী নিজের অধিকার থেকে কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে তা অবলীলায় এড়িয়ে যাওয়া হয়।

যখনই দাম্পত্যে সমতা বা পারস্পরিক জবাবদিহির প্রশ্ন আসে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তি ও বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে আবেগকে একপেশে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কোনো একজন যৌক্তিক বিষয়ে ব্যাখ্যা বা কৈফিয়ত চাইলে অপরজন নানা বাহানা করা, পুরোনো অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু টেনে এনে কান্নাকাটি করা কিংবা রাগ করে ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার মতো একধরনের ‘আবেগীয় ব্ল্যাকমেইল’ বা মানসিক জিম্মিদশার পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এই ব্ল্যাকমেইল আরও সহজ হয়, যখন ঘরে থাকে নিষ্পাপ ছেলেমেয়ে কিংবা কোনো অসুস্থ বাবা-মা বা নির্ভরশীল অন্য কেউ। “তুমি এমন করলে বাচ্চার ক্ষতি হবে” কিংবা “আমার অসুস্থ মা-বাবা এই ধাক্কা সহ্য করতে পারবেন না”—এমন আবেগীয় ফাঁদ তৈরি করে জীবনসঙ্গীকে অন্যায়ভাবে অপরাধবোধের সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। সম্পর্কের শান্তি রক্ষা এবং প্রিয়জনদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে ভুক্তভোগী স্বামী বা স্ত্রী তখন নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে অন্যায় আবদারের কাছেও নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। আলোচনার মাধ্যমে যে সাধারণ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ছিল, সেখানে আবেগের এমন অনৈতিক ও কৌশলী ব্যবহার সম্পর্কের দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ‘তিলসমতুল্য’ ছোট ভুলগুলো বিশাল ‘তাল’ হয়ে দাঁড়ায় এবং অপরজন একসময় নিজের ক্ষোভ ও কষ্ট মনের ভেতর চেপে রাখতে রাখতে ভেতরে ভেতরে এক গভীর মানসিক দূরত্ব তৈরি করেন, যা সংসারকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দেয়।

আমাদের সমাজে একটি অলিখিত ধারণা প্রচলিত আছে যে, বাবা-মা মানেই সবসময় অভ্রান্ত এবং তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই সন্তানের মঙ্গলের জন্য। কিন্তু বাস্তবতার উল্টো পিঠের চিত্রটি কখনো কখনো এতটাই নির্মম যে, তা সমস্ত মানবিক বোধকে স্তব্ধ করে দেয়। দাম্পত্যের অহংকারের লড়াই যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন অনেক সময় মা-বাবারা অবচেতনভাবেই সন্তানকে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেন। শাসনের নামে ঘরে ঘরে চলে এই নির্মম মানসিক শোষণ। এর ফলে সন্তানের মনে জন্মদাতার প্রতি এমন এক তীব্র ক্ষোভ ও বৈরাগ্য তৈরি হয়, যা সমাজতত্ত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। চব্বিশ বছর বয়সী একজন তরুণীর বাস্তব আকুতি আজ আমাদের সমাজতত্ত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তিনি ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—“আমি মারা গেলে আমার মা-বাবা যেন আমাকে শেষবার দেখতেও না আসেন।” দাম্পত্যের এই ‘তিলসমতুল্য’ জেদ কীভাবে সন্তানের মনে জন্মদাতার প্রতি চরম বৈরাগ্য ও ক্ষোভ তৈরি করে, তা ভাববার সময় এসেছে।

এই পারিবারিক অশান্তি ও অস্থিরতার বৃত্তে সমাজ যখন এক সন্তানকে ‘ভবিষ্যতের আয়ের উৎস’ আর অন্য সন্তানকে ‘ঘাড়ের বোঝা’ মনে করে বৈষম্যের দেয়াল তোলে, তখন তা সন্তানের আত্মমর্যাদাকে আজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়। দাম্পত্যকলহের জেরে অনেক সময় মা-বাবারা নিজেদের অজান্তেই এক সন্তানের পক্ষ নেন বা অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব দেখান। এর কারণে ভাই ও বোনের মধ্যে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা বড় হয়ে পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমা এবং আজীবনের জন্য মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী-স্ত্রীর তুচ্ছ জেদ এভাবে পরবর্তী প্রজন্মের সম্পর্কের সুতোকেও চিরতরে ছিঁড়ে ফেলে।

সম্পর্ক ও বৈষম্যের এই চাকা যখন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, তখন তা বার্ধক্যের এক করুণ ও নিষ্ঠুর রূপ ধারণ করে। যৌবনে যে দম্পতি তুচ্ছ অহংকারে একে অপরকে ছাড় দেননি, বার্ধক্যে এসে তাঁরা চরম একাকীত্বের মুখোমুখি হন। দেখা যায়, বয়স যত বাড়ে, ঘরের মূল উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ততটাই দুর্বল হয়ে পড়েন। একসময় যখন তাঁর নিজস্ব কোনো আয় থাকে না, তখন প্রতিটি ছোটখাটো খরচের জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, শৈশব থেকে মা-বাবার প্রতিনিয়ত ঝগড়া এবং একপেশে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের কারণে সন্তানরাও বড় হয়ে বাবার প্রতি অবহেলা বা মায়ের একতরফা নালিশ শুনে যেকোনো একজনের পক্ষ নেয়। এর ফলে একদা প্রতাপশালী মানুষটি নিজের ঘরেই চরম একা ও অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যান। বৃদ্ধাশ্রমের পেছনের অদৃশ্য সত্যটি হয়তো এটাই যে, শৈশবের ট্রমা ও বার্ধক্যের এই চরম অবহেলার শিকার হয়ে একসময়ের আপন নীড়ই মানুষের জন্য জীবন্ত নরক হয়ে ওঠে।

সম্পর্কচ্ছেদ বা বিবাহবিচ্ছেদ হয়তো দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আইনি ও ধর্মীয় অধিকার, কিন্তু এর চূড়ান্ত ও নিষ্ঠুর মূল্য চোকাতে হয় পুরো পরিবারকে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবারগুলোতে বিচ্ছেদের কালো মেঘ ঘনিয়ে এলে সবচেয়ে কঠিন ও অসহায় পরিস্থিতিতে পড়েন বাবা বা স্বামীরা। একদিকে বিচ্ছেদের পর সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়ার তীব্র ভয়, অন্যদিকে আইন ও সমাজের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সন্তানকে চিরতরে হারানোর আতঙ্ক পুরুষটিকে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। অনেক সময় স্ত্রীর অন্যায্য আবদার, অলিখিত দ্বিমুখী আচরণ কিংবা তীব্র আবেগীয় ব্ল্যাকমেইলের মুখোমুখি হয়েও একজন বাবা কেবল সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং তার সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আপস করেন। নিজের সমস্ত আত্মসম্মান, অহংবোধ এবং ক্ষোভকে বিসর্জন দিয়ে তিনি মুখ বুজে সবকিছু মেনে নেন। এই ধরনের আপস বাহ্যিকভাবে সংসারকে টিকিয়ে রাখলেও পুরুষটির মনের ভেতর একধরনের নীরব রক্তক্ষরণ ও গভীর অবসাদ তৈরি করে। সন্তানের জন্য একজন বাবার এই নিঃশব্দ আত্মত্যাগ ও মানিয়ে নেওয়ার লড়াইও আধুনিক সংসারের অন্যতম এক অলিখিত বাস্তবতা।

ভাঙা পরিবার রাষ্ট্রে অপরাধপ্রবণতা ও কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি করে। আমাদের সমাজে এখনো একক অভিভাবকত্বের সংকট অত্যন্ত প্রকট; একা একজন মানুষের পক্ষে সন্তানকে সামাজিকভাবে শতভাগ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে বড় করা বড্ড কঠিন। সামাজিক বাঁকা চাহনির কারণে সেই আংশিক পরিবারটি সমাজ থেকে একধরনের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছেদের চাবুক দুপক্ষের বৃদ্ধ মা-বাবাকেও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করে। সমাজে যখন একের পর এক তুচ্ছ কারণে বিচ্ছেদের মহোৎসব চলতে থাকে, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘সংসার’ নামক পবিত্র বন্ধনটির গুরুত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। চারপাশে এমন আশঙ্কাজনক ভাঙন দেখে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের মনে বিয়ের প্রতি একধরনের ভয় ও বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি তীব্র অবিশ্বাসের জন্ম হয়, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের প্রধান অন্তরায়।

এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, বিষাক্ত ট্রমা ও সামাজিক অমঙ্গল থেকে বের হয়ে আসতে হলে স্বামী-স্ত্রীর মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন ও বৈজ্ঞানিক সমন্বয় প্রয়োজন। তবে এই আপস বা মানিয়ে নেওয়াটা কখনোই একপেশে হওয়া উচিত নয়। কেবল স্বামী বা বাবাকেই সন্তানের দোহাই দিয়ে সব অন্যায় মেনে নিতে হবে—এই নেতিবাচক মানসিকতা সমাজ থেকে পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। দাম্পত্যের রসায়নে অধিকার ও কর্তব্যের একটি সুস্থ ভারসাম্য বা পারস্পরিক সমন্বয় থাকাটা আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।

এর পাশাপাশি দাম্পত্যজীবনে একে অপরকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা নিজস্ব ‘স্পেস’ দেওয়া বড্ড প্রয়োজন। প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব কিছু সময়, নিজস্ব শখ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানোর মতো ব্যক্তিগত অবসর থাকা উচিত। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো সম্পর্কের ভেতরের দৈনন্দিন দমবন্ধ ভাবকে নিমেষেই দূর করে মনের সতেজতা ফিরিয়ে আনে। স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই বুঝতে হবে, অনমনীয় আমিত্ব ও অহংকারের লড়াইয়ে দিনশেষে হেরে যায় তাঁদের নিষ্পাপ সন্তানই। তাই যেকোনো ক্ষোভ প্রকাশের আগে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবা উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, ত্রুটিহীন মানুষ যেমন এ পৃথিবীতে মেলা ভার, তেমনি নিখুঁত কোনো সম্পর্কও আকাশ থেকে ঝরে পড়ে না। নিজের অন্ধ অহংকার, রাগ, ক্ষোভ আর ইগোর লড়াই বিসর্জন দিয়ে আমাদের দিন দিন আরও সহনশীল হতে হবে। সেকালের সেই প্রশ্নাতীত ত্যাগের মহিমা ও আত্মিক অটুট বন্ধনের সঙ্গে একালের বৈজ্ঞানিক মনস্তত্ত্ব ও পারস্পরিক অধিকারের এক সুন্দর সমন্বয় আজ বড্ড প্রয়োজন। দাম্পত্যের এই ঝাল-টক-মিষ্টির রসায়নকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে মরণ পর্যন্ত টেনে নেওয়ার নামই তো প্রকৃত সংসার। সুস্থ সমাজ, নিরাপদ শৈশব এবং একটি বাসযোগ্য সুন্দর প্রজন্মের স্বার্থে আমাদের ঘরে ঘরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সুবাতাস ফিরে আসুক—আজকের দিনে এটিই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

লেখক: অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

তিল থেকে তাল: তুচ্ছ অহংকারে যখন ভাঙছে সংসার

বিস্তারিত কমেন্টে