বিশ্বজুড়ে ইলিশের প্রধান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। একসময় যে দেশের ইলিশ প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত রপ্তানি হতো, আজ সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে উল্টো ভারত থেকেই টনে টনে ইলিশ আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত দুই মাসে শুধু বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েই প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে ১৯টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। যার একটি বড় অংশ এসেছে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাট থেকে।
আমদানিকারক, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত রুট দিয়ে এখনো ভারতের ইলিশের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানান, গত দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে এবং এর প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে সংগৃহীত।
বাজারে সরবরাহ সংকট ও দামের বিশাল ফারাক মৌসুম চলাকালীন খোদ বাংলাদেশে ইলিশের তীব্র সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দামের আকাশপাতাল পার্থক্যকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ভারত থেকে ইলিশের ক্রয়মূল্য পড়ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২ ডলার (প্রায় ২৪৬ টাকা) বা তারও কম। এরপর পরিবহন, কাস্টমস শুল্ক ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ যোগ করার পরও দেশীয় বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে এই মাছ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
অথচ বর্তমানে রাজধানীর বাজারে ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায়। ১ কেজির বেশি ওজনের মাছের দাম ঠেকেছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এছাড়া ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৭০০ গ্রামের মাছ ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশের বাজারে এমন উচ্চমূল্যের কারণেই ব্যবসায়ীরা আমদানির দিকে ঝুঁকছেন। মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক জানান, বাজারে ইলিশের তীব্র সংকট থাকায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
টানা তিন বছর ধরে কমছে দেশের উৎপাদন দেশে প্রায় দুই দশক ধরে ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও গত তিন বছর ধরে তা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে ৫ লাখ ৪ হাজার টনে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানের মতে, নদীর নাব্যতা সংকট, নির্বিচারে বালু উত্তোলন, কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন এবং নদীদূষণের কারণে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক পরিযান পথ (মাইগ্রেটরি রুট) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে নেওয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ছয় বছর মেয়াদি বিশেষ প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ফলাফল নিয়েও এখন জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
গুজরাট থেকে যেভাবে আসছে ইলিশ পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর ভারতের গুজরাট উপকূলে ইলিশের ব্যাপক ফলন ও জোগান হয়েছে। গুজরাটের ভারুচ জেলার ভাদভূত মোহনা, জম্বুসার ও হানসোট এলাকায় নর্মদা নদী সাগরে মেশার স্থানে প্রচুর বড় আকারের ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়ছে। সেখান থেকে প্রতিদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ ট্রাকে করে মাছ হাওড়ার পাইকারি বাজারে পৌঁছায় এবং পরে তা পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ যেখানে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, সেখানে প্রকৃত রপ্তানি ১১০ টনেরও নিচে নেমে আসে। ফলে অভ্যন্তরীণ নদী রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ইলিশের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আধিপত্য গভীর ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা।
kalprakash.com/IM