যুক্তরাজ্য সরকারের প্রস্তাবিত নতুন করপোরেট সংস্কার দেশটির নিওলিবারেল বা নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে সেটিকে আরও বেশি শক্তিশালী ও স্থায়ী করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। ব্রিটিশ সরকার করপোরেট খাতে তথাকথিত ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর যুক্তি দিলেও প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো সাধারণ কর্মী ও বৃহত্তর সমাজের স্বার্থের চেয়ে শীর্ষ শেয়ারহোল্ডার ও উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপকদের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিক করপোরেট কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য নিয়ে পুরোনো এক অর্থনৈতিক মতবাদ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান ১৯৭০ সালে মত দিয়েছিলেন যে, একটি ব্যবসার একমাত্র সামাজিক দায়িত্ব হলো মুনাফা বৃদ্ধি করা। ফ্রিডম্যানের এই দর্শনই নিওলিবারেল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিরূপে প্রতিষ্ঠা পায়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে যুক্তরাজ্যে বর্তমানে করপোরেট প্রধান বা প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) গড় বেতন সাধারণ কর্মীদের তুলনায় প্রায় ১৩০ গুণ পর্যন্ত বেশি।
যুক্তরাজ্য সরকারের চলমান ১২ সপ্তাহের পরামর্শ প্রক্রিয়াটি মূলত করপোরেট রিপোর্টিং ব্যবস্থার জটিলতা কমিয়ে সরল করার কথা বলে শুরু হয়েছে। অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন অত্যন্ত দীর্ঘ হওয়ায় তা কিছু ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত করার যৌক্তিকতা থাকতে পারে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকার এমন কিছু বাধ্যতামূলক তথ্য প্রকাশের বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করছে, যা করপোরেট বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো সিইও এবং সাধারণ কর্মীদের মধ্যকার ‘বেতন অনুপাত’ (CEO-to-worker pay ratio) প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বাতিলের প্রস্তাব। যুক্তরাজ্যের শীর্ষ নির্বাহীরা এমনিতেই ইউরোপের সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় গড়ে ৯৫ শতাংশ বেশি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে এই বেতন অনুপাত প্রকাশ্যে না থাকলে সাধারণ জনগণ, কর্মী ও দায়িত্বশীল বিনিয়োগকারীদের পক্ষে করপোরেট বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র জানা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত বেতন পাওয়া শীর্ষ নির্বাহীরাই যে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ান—এমন দাবির পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ নেই। বরং কর্মীদের ন্যায্য মজুরি দিয়ে মানবসম্পদে কতটা বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা বোঝার জন্য এই অনুপাত অত্যন্ত কার্যকরী।
এছাড়া করপোরেট পরিচালকদের অস্বাভাবিক পারিশ্রমিক নির্ধারণে শেয়ারহোল্ডারদের বার্ষিক ভোটাধিকার বাতিলের প্রস্তাব নিয়েও তীব্র আপত্তি উঠেছে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র শাসনামলে করপোরেট নির্বাহীদের লাগামহীন বেতন নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের বার্ষিক ভোটের বিধান চালু করা হয়েছিল। এটি বাতিল হলে করপোরেট বোর্ডগুলোর জবাবদিহির পরিধি আরও সংকুচিত হবে।
একইভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) পুরোপুরি অনলাইনে আয়োজনের অনুমতির সমালোচনা করা হচ্ছে। ভার্চুয়াল সভায় শেয়ারহোল্ডারদের সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ কমে যায়, ফলে সরাসরি উপস্থিতির সভায় যে ধরনের গণতান্ত্রিক বিতর্ক ও জবাবদিহির চাপ তৈরি হয়, তা সহজেই এড়িয়ে যেতে পারেন করপোরেট কর্তারা। চলতি বছরের শুরুতে বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি বিপির (BP) অর্ধেকের বেশি শেয়ারহোল্ডার ভার্চুয়াল সভার বিরোধিতা করে সরাসরি এজিএম বহাল রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
অর্থনীতি ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, করপোরেট রিপোর্টিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হলে তথ্য লুকানোর বদলে এমন একটি সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে পরিচালনা পর্ষদে সাধারণ কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে এবং জীবনধারণের ন্যূনতম মজুরির নিচে থাকা কর্মীদের সুরক্ষার বিধান থাকবে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ক্যাথারিনা পিস্টরের মতে, করপোরেট আইন নিজেই সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ ও চরম বৈষম্য তৈরির একটি অন্যতম হাতিয়ার। ফলে সরকার যদি সত্যিই বৈষম্যহীন অর্থব্যবস্থা গড়তে চায়, তবে করপোরেট ব্যবস্থার এই একতরফা সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে মৌলিক ও টেকসই জবাবদিহিমূলক সংস্কারের পথেই এগোতে হবে।
kalprakash.com/IM