ভিত্তির নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় পাশের পুকুরে ধসে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে পাবনার ফরিদপুর উপজেলার শতবর্ষী বৃলাহিড়ীবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ভবনে। দীর্ঘ চার বছর ধরে ভবনটি এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংস্কার, অপসারণ কিংবা বিকল্প শ্রেণিকক্ষের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে যেকোনো মুহূর্তে ভবন ধসের চরম আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ ওই ভবনে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যালয়ের ২৬৫ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী।
১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ১১১ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠটি ফরিদপুর উপজেলার বি এল বাড়ি গ্রামে অবস্থিত। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১০ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের দুটি একতলা ভবনের মধ্যে একটি ১৯৯৫ সালে ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্টের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়। বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে পুকুরের পাড় ঘেঁষে নির্মিত এই ভবনটির নিচের মাটি বিগত কয়েক বছর ধরে ধসে যেতে শুরু করে। বর্তমানে ভবনের ভিত্তি থেকে বড় অংশজুড়ে মাটি সরে গিয়ে পুরো ভবনটিই পুকুরের দিকে বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছে। এতে যেকোনো সময় ভবনটির একাংশ পুকুরে ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতী খাতুন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে, ‘আমাদের ওই ভাঙা ভবনেই প্রতিদিন ক্লাস করতে হয়। কখন ছাদ ধসে পড়ে বা পুরো ভবন ভেঙে পুকুরে তলিয়ে যায়, সেই ভয় সবসময় তাড়া করে। এত ভয় নিয়ে কি পড়াশোনা করা যায়?’
সহকারী শিক্ষিকা রেশমা জানান, ‘শিশু শ্রেণিতে ক্লাস নেওয়ার সময় বাচ্চাদের ওই ঝুঁকিপূর্ণ অংশ থেকে সরিয়ে দেয়ালের একপাশে বসাই। ক্লাস নেওয়ার সময় সবসময় বুক কাঁপে, হঠাৎ ভবনটি ধসে পড়লে নিষ্পাপ শিশুদের কীভাবে রক্ষা করব।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত চার বছর ধরে ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষা বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ভবন ঝুঁকির পাশাপাশি নানাবিধ অবকাঠামোগত সংকটেও ভুগছে শতবর্ষী এই বিদ্যালয়টি। ক্যাম্পাসে কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। নেই শিক্ষার্থীদের উপযোগী খেলার মাঠও। সামান্য বৃষ্টি হলেই সামনের ছোট মাঠে পানি জমে যায় এবং সেই কাদা-পানি মাড়িয়েই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
সহকারী শিক্ষক মো. আল মামুন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। বৃষ্টিতে মাঠে পানি জমে যায়। এর ওপর হেলে পড়া ভবনের ঝুঁকি তো রয়েছেই। এসব সার্বিক সংকট মাথায় নিয়েই শিক্ষকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন।’
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৮ জুলাই সব সমস্যার বিস্তারিত জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেন প্রধান শিক্ষক মোছা. নাসিমা নাসরিন। তবে এখনও পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি সংস্কার বা বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা হয়নি। বাধ্য হয়ে সেখানে শিশু শ্রেণি, তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালানো হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক নাসিমা নাসরিন বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েছি। আশা করছি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা ও নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ফরিদপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খ. ম. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বিদ্যালয়ের আবেদনটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি ইতিবাচক সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী।
ঐতিহ্যবাহী এই শতবর্ষী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পাঠদানের পরিবেশ তৈরিতে অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি অপসারণ, নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ, সীমানাপ্রাচীর স্থাপন ও মাঠ সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
kalprakash.com/IM