হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন এক কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের ৪৫টি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে দেশটি। শুধু তাই নয়, এসব জাহাজের সঙ্গে পণ্য স্থানান্তরের কাজে যুক্ত অন্য যেকোনো নৌযানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের নবগঠিত ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ এ তথ্য জানায়। হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য সম্প্রতি এই সংস্থাটি গঠন করেছে তেহরান। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।
পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানায়, তালিকাভুক্ত জাহাজগুলোকে জরিমানা করা হতে পারে, এমনকি আটক ও তাদের বহন করা পণ্যও জব্দ করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের হুমকি দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের এই সতর্কবার্তা এল। এর আগে তেহরানও সতর্ক করে জানিয়েছিল, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হুমকি দিলে তার জবাব হবে ‘বিধ্বংসী’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের প্রকাশ করা কালো তালিকায় রয়েছে অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার (ভিএলসিসি), তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকার, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবাহী জাহাজ এবং পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য পরিবহনকারী ট্যাংকারসহ বিভিন্ন ধরনের নৌযান।
তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিএনওসি লজিস্টিকস অ্যান্ড শিপিংয়ের (ADNOC L&S) মালিকানাধীন। এ ছাড়া এডিএনওসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান নেভিগ৮ ট্যাংকারস এবং সৌদি আরবের জাতীয় শিপিং কোম্পানি ‘বাহরি’র মালিকানাধীন জাহাজও এ তালিকায় রয়েছে।
জাহাজ আটক ও পণ্য জব্দের হুঁশিয়ারি ইরানের এক্স পোস্টে বলা হয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত জাহাজগুলোর সঙ্গে সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর বা ‘শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার’-এ অংশ নেওয়া অন্যান্য নৌযানগুলোকেও ভবিষ্যতে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। তবে কোন নির্দিষ্ট নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে এসব জাহাজকে ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা বিস্তারিত স্পষ্ট করেনি ইরানি কর্তৃপক্ষ।
এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হলে জাহাজের মালিকদের অবশ্যই ইরানের অনুমোদন নিতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেবার জন্য জাহাজগুলোকে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে। তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও তথ্যসহ ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হবে।
হরমুজে তেল পরিবহন ব্যাহত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর আগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। সংঘাতের কারণে ট্যাংকার চলাচল ব্যাহত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে কিছু ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালি পার করিয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ সুপারট্যাংকারে পণ্য স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির সাত দিনের গড় এখন দৈনিক ৮০ লাখ ব্যারেলের বেশি। তার দাবি, মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতির কারণেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন পথ ঘিরে বিশ্ববাজারে নতুন করে উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী নিয়ম না মানা বা ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ প্রায় ৩০০ জাহাজের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করেছে ইরান।
kalprakash.com/IM