জুলাই বিপ্লবে প্রথম সহিংস পুলিশি হামলা ও ওই হামলার প্রতিবাদের স্বীকৃতিস্বরূপ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) জুলাই প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে দিবসটি উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রতিরোধ দিবস উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করীম। মুখ্য আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তারিন বিনতে এনাম এবং আইসিটি বিভাগের প্রভাষক মবিনুর রহমান।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং জুলাই আন্দোলনে শহিদ কুবির শিক্ষার্থী আবদুল কাইয়ুমের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন এবং জুলাই আন্দোলনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বীরত্ব নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনের সময় কুবির শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা স্থানীয় ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে আলোচনা সভা শুরু হয়।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জুলাই-পরবর্তী সময়ে ছাত্ররাজনীতি চালু ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি নতুন ও পুরোনো ক্যাম্পাসের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবিও উপস্থাপন করা হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, ২৪-এর আন্দোলন শুধু সরকার পতনের নয়, এটি রাষ্ট্র সংস্কারের আন্দোলন। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, মেধার মূল্যায়ন হবে এবং গবেষণা, মানবতা ও জাতীয় উন্নয়ন রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারে, এই দেশ আমাদের, এই দেশ ন্যায়ের, এই দেশ মানবতার। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ইতিহাস আমাদের শুধু অতীতকে মনে করিয়ে দেয় না, ভবিষ্যতের পথও দেখায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, সত্যে অবিচল থাকা এবং গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই প্রতিরোধের প্রকৃত শিক্ষা। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মতের ভিন্নতা ও প্রতিযোগিতা থাকলেও সহিংসতা, বৈষম্য বা পারস্পরিক অসম্মান থাকবে না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করীম বলেন, আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য স্টুডেন্ট ফার্স্ট। জুলাইয়ে ছাত্রীরা তাদের ভাইদের আগলে রেখেছিল এবং বিজয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের সেই ভূমিকাকে স্মরণীয় করে রাখতে ছাত্রীদের জন্য অরুণিমা কর্নার নামে একটি কর্নার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম, নামাজ আদায়ের স্থান এবং ক্লাসের ফাঁকে বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকবে। প্রয়োজনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারেরও ব্যবস্থা করা হবে।
মুখ্য আলোচক অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, জুলাইয়ের এই সফলতার মূল মন্ত্র ছিল ঐক্য। দলমত নির্বিশেষে দেশ-বিদেশের মানুষ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কারণেই ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। রাষ্ট্রবিরোধী এই ক্ষমতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তি দাঁড়িয়েছিল বলেই এই আন্দোলন সফল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির জন্য শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রয়োজন। কুবির শিক্ষার্থীদের খাবার, আবাসন ও যাতায়াত সুবিধার উন্নয়নে বর্তমান প্রশাসনকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাই।
সরকারি চাকরি প্রাপ্তির বিষয়ে তিনি বলেন, এখন পেছনের দরজা দিয়ে চাকরি পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছরে এসব বন্ধ করতে পেরেছি। সফলভাবে প্রশ্নফাঁস রোধ করা হয়েছে এবং এ সময়ে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, আজকের অনুষ্ঠানের সম্মানিত মুখ্য আলোচক, আমার সকল সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
kalprakash.com/IM
বাবলু দেব, কুবি প্রতিনিধি 























