কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) পাঁচটি আবাসিক হলের ডাইনিং ব্যবস্থার প্রতি দিন দিন অনাগ্রহ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের। খাবারের নিম্নমান, একঘেয়ে মেনু, স্বাদের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগে অধিকাংশ আবাসিক শিক্ষার্থী হলের ডাইনিং এড়িয়ে চলছেন। ফলে বিকল্প হিসেবে বাইরের হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন তারা, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের আর্থিক ব্যয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় একই ধরনের খাবার পরিবেশন, নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে গেলে খাবার না পাওয়া এবং খাবারের স্বাদ ও মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে তারা বাধ্য হয়ে বাইরের খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ডাইনিং ব্যবস্থা আরও অকার্যকর হয়ে পড়বে।
কাজী নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রুবায়েত হোসাইন বলেন, “দুপুরে মাছ, মাংস কিংবা ডিম দেওয়া হলেও খাবারে তেমন কোনো স্বাদ থাকে না। বিশেষ করে রাতের খাবার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে প্রায়ই বাইরের হোটেলে খেতে হয়। বিভিন্ন সময় কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ের বাবুর্চিরা জানান, সাধারণত এক বেলা মাছ ও এক বেলা মাংস পরিবেশন করা হয়। এছাড়া সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন শাক-সবজি, ভাজি বা ভর্তা রাখা হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় সপ্তাহজুড়ে ব্রয়লার মুরগি ও মাছের একই ধরনের মেনু পরিবেশন করা হয়, যার স্বাদ ও মান সন্তোষজনক নয়। ফলে বাইরের হোটেলের খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “ডাইনিংয়ে নিয়মিত একই ধরনের খাবার, বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি দেওয়া হয়। মাংসের টুকরোগুলোও খুব ছোট থাকে। যে টাকা দিয়ে এই খাবার খেতে হয়, একই খরচে বাইরে আরও ভালো ও বৈচিত্র্যময় খাবার পাওয়া যায়।”
হলের মিল ম্যানেজাররা জানান, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে একই ধরনের মেনু রাখতে হচ্ছে। বাড়তি খরচের কারণে একাধিক তরকারি দেওয়া সম্ভব হয় না। মাছের দাম বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে ব্রয়লার মুরগি বেশি পরিবেশন করতে হচ্ছে। বর্তমান মিল রেটে উন্নত মানের খাবার দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়া হলে খাবারের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো সম্ভব হবে।
এদিকে নারী শিক্ষার্থীদের দুটি হল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। শিক্ষার্থীরা জানান, খাবারের মান এতটাই নিম্নমানের যে অনেক সময় ফুড পয়জনিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণে অধিকাংশ ছাত্রী হলের ডাইনিং এড়িয়ে বাইরের হোটেল কিংবা নিজে রান্না করে খাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাসমিয়া ফারিন বলেন, “মিলের টাকা অনুযায়ী খাবারের মান আরও ভালো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায়ই এমন খাবার দেওয়া হয়, যা খেয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েন। একই টাকায় বাইরে অনেক ভালো ও স্বাস্থ্যকর খাবার পাওয়া যায়।”
শিক্ষার্থীরা জানান, অনেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেন। ফলে রাত ৯টার আগে হলে ফিরতে পারেন না। কিন্তু রাতের খাবারের টোকেন সংগ্রহের সময় রাত ৯টা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকায় অনেকেই টোকেন সংগ্রহ করতে না পেরে বাইরে খেতে বাধ্য হন।
সুনীতি শান্তি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মিমি বলেন, “রাত ৯টার পর আর টোকেন দেওয়া হয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বাইরে খেয়ে হলে ফিরতে বাধ্য হন। টোকেন সংগ্রহের সময় বাড়ানো, খাবারের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাবার পরিবেশন করা হলে ডাইনিংয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়বে।”
এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক ও কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ মো. হারুন বলেন, “শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমার অন্যতম কারণ একঘেয়ে মেনু। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে মেনুতে পরিবর্তন এনেছিলাম। এরপরও অনেক শিক্ষার্থী বাইরের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।”
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে ডাইনিং পরিচালনার জন্য কোনো ভর্তুকি পাওয়া যায় না। তারপরও প্রশাসনের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। নতুন উপাচার্যের কাছেও ভর্তুকির বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের নিজস্ব আয়ের উৎস থাকায় ডাইনিংয়ে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এমন কোনো স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মো. জনি আলম বলেন, “খাবারের মান উন্নয়ন ও হলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতি মাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়। সমস্যা চিহ্নিত করে অতিরিক্ত বাবুর্চি নিয়োগ এবং মেনু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি নিয়মিত ডাইনিং মনিটরিং করি। অনেক সময় কাউকে না জানিয়েই ডাইনিংয়ে খাবার খাই এবং কোথাও সমস্যা দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিই।”
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের প্রাধ্যক্ষ ড. সুমাইয়া আফরীন সানি বলেন, “অনেক ছাত্রী খরচ কমানোর জন্য নিজেরাই রান্না করেন। এ কারণেও ডাইনিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।”
খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “অনেক সময় শিক্ষার্থীদের খাদ্যপণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না। তারপরও আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ মানের খাবার নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং করছি।”
কুবি প্রতিনিধি 


















