পবিত্র আশুরা উপলক্ষে কারবালার মহান আত্মত্যাগের স্মরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) মিলাদ-মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের ১০৩ নম্বর কক্ষে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মহররম মাসের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। পরে হামদ-নাত, গজল পরিবেশন, দরুদ শরিফ পাঠ, রাসুল (সা.)–এর রওজা মোবারকে সালাম পেশ এবং বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে মিলাদ-মাহফিল সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় পর্বে কারবালার শোকাবহ ঘটনা, ইসলামের ইতিহাসে এর তাৎপর্য এবং মানবতার জন্য ইমাম হোসাইন (রা.)–এর আত্মত্যাগের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাদমান মাহমুদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সিএলসি ইনস্টিটিউটের প্রভাষক হাসান নাঈম। তিনি বলেন, “শিয়া ঐতিহ্যে কারবালার মাটিকে ‘খাকে শিফা’ বা নিরাময়ের মাটি বলা হয়। তাঁদের বিশ্বাস, ইমাম হোসাইন (রা.)–এর আত্মত্যাগের স্মারক এই মাটি মানুষের অন্তরের ব্যাধি দূর করার প্রতীক।”
তিনি আরও বলেন, “ইতিহাসে আর কোনো কারবালা সৃষ্টি হয়নি, যেমন আর কোনো হোসাইনও জন্ম নেননি। হক ও বাতিলের সংঘাত বহুবার ঘটেছে, কিন্তু কারবালার মতো এমন অসম যুদ্ধ আর দেখা যায়নি। মাত্র ৭২ জন সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে কয়েক হাজার সশস্ত্র সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তৃষ্ণার্ত অবস্থায়ও ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। কারবালার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, যারা নিজেদের ইসলামের অনুসারী দাবি করছিল, তারাই ‘নারায়ে তাকবির’ ধ্বনি দিতে দিতে মহানবী (সা.)–এর প্রিয় দৌহিত্রকে হত্যা করেছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ধর্মের নাম ব্যবহার করেও সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব।”
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ উল্লাহ। তিনি বলেন, “সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা সমাজে শিয়া-সুন্নি, হিন্দু-মুসলিম, খ্রিস্টানসহ নানা বিভাজন দেখি। কিন্তু দর্শনের দৃষ্টিতে এসব বিভাজন গৌণ হয়ে যায়। তখন দুটি মৌলিক সত্য সামনে আসে—সব মানুষই এক স্রষ্টার সৃষ্টি এবং মানুষের প্রকৃত অবস্থান হক ও বাতিলের পক্ষে। তাই মানুষের পরিচয় ধর্মীয় বিভাজনে নয়; বরং সে সত্যের পক্ষে নাকি মিথ্যার পক্ষে, সেটিই মুখ্য।”
তিনি আরও বলেন, “মহররমের এই আলোচনা আগামী দিনে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ হবে বলে আমি আশা করি। রাসুল (সা.), ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগের চেতনা আমাদের অন্তরে সবসময় জাগ্রত থাকবে। বিভাজন ও সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্য, ন্যায় ও মানবতার পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়েই সেই চেতনার বাস্তবায়ন সম্ভব।”
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষ থেকে দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল হামিদ আল জাবেদ বলেন, “কারবালার মতো বিভাজন ও সংঘাত যেন আর কখনো সৃষ্টি না হয়, সেই শিক্ষাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। কারবালাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এসব আলোচনা ও কর্মসূচির মাধ্যমে সত্য, ন্যায়, আত্মত্যাগ এবং আদর্শের জন্য অবিচল থাকার শিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যায় ও জুলুমের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেয়ে সত্যের পথে আত্মত্যাগের আদর্শই শ্রেষ্ঠ। কারবালার শিক্ষা আমাদের সেই সাহস ও নৈতিক শক্তির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।”
জাবি প্রতিনিধি 



















