জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভূগর্ভে সুপেয় পানির বিশাল দুটি স্তরের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের তলদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত দুটি বিশাল মিঠাপানির স্তর বিদ্যমান। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজির একদল গবেষক।
গবেষণার অংশ হিসেবে খুলনা থেকে পশুর নদী অববাহিকা পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার এলাকায় ২৫টি স্থানে অনুসন্ধান চালানো হয়। বিজ্ঞানীরা জানান, বরফ যুগে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মিঠাপানি ও বৃষ্টির পানি গভীর বালুময় স্তরে জমা হয়েছিল। পরবর্তীতে শক্ত কাদামাটির স্তর সেই পানি হাজার হাজার বছর ধরে সংরক্ষণ করে রেখেছে।
গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, প্রথম মিঠাপানির স্তরটি প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এর গভীরতা প্রায় ৮০০ মিটার পর্যন্ত। দ্বিতীয় স্তরটি সুন্দরবনের কেন্দ্রীয় অংশের নিচে ২৫ থেকে ২৫০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত, যার বিস্তৃতিও প্রায় ৪০ কিলোমিটার। যদিও দ্বিতীয় স্তরে কিছুটা লবণাক্ততার উপস্থিতি রয়েছে, তবুও এটি ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ অগভীর নলকূপের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুষ্ক মৌসুমে অনেক নারীকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এ বাস্তবতায় নতুন আবিষ্কৃত পানির ভাণ্ডার দীর্ঘমেয়াদে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পানি ১০ থেকে ২৫ হাজার বছর আগের সংরক্ষিত সম্পদ এবং এটি দ্রুত পুনর্নবীকরণযোগ্য কোনো উৎস নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা জানিয়েছেন, এ পানিকে সাধারণ ব্যবহারের উৎস হিসেবে নয়, বরং জাতীয় কৌশলগত পানির রিজার্ভ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলে লবণাক্ত পানি মিঠাপানির স্তরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে এই সম্পদ সংরক্ষণে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বিকল্প নেই।
উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তার জন্য এই আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে কতটা দায়িত্বশীল ও পরিকল্পিতভাবে এ সম্পদের ব্যবস্থাপনা করা হয়, তার ওপর।
প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি 

















