যে ‘অভিন্ন নীতিমালা’ বাতিলের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে কঠোর আন্দোলন করেছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষকরা, অবশেষে সেই নীতিমালাই মেনে নিয়েছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত শিক্ষকদের পদোন্নতির ‘অভিন্ন নীতিমালা’ মেনে নিয়ে গত বুধবার (১০ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ১২৭ জন শিক্ষক সম্মতি প্রকাশ করেছেন। শিক্ষকদের এই সম্মতিপত্রের একটি কপি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
এর আগে, নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান নীতিমালার অধীনে পদোন্নতির দাবি এবং ইউজিসির নতুন নীতিমালা বাতিলের দাবিতে গত ১৯ মে থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত টানা ২৫ দিন আন্দোলন করেছিলেন শিক্ষকরা।
আন্দোলন চলাকালে শিক্ষকরা আমরণ অনশন, বিশ্ববিদ্যালয় লকডাউন এবং সর্বশেষ তৎকালীন উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অনড় ছিলেন। শিক্ষকদের এই দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত ৪৬টি পরীক্ষা স্থগিত হয়। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম সেশনজট ও ভোগান্তির মুখে পড়েন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অচলাবস্থা ও আন্দোলনমুখী পরিস্থিতির মধ্যে গত ১৪ মে সরকার দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) পদে বড় ধরনের রদবদল আনে। এর ধারাবাহিকতায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. তৌফিক আলমকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষকরা তাঁদের কঠোর আন্দোলন থেকে সরে আসেন।
শিক্ষকদের এই দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা মারাত্মক সেশনজটের মুখে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত আন্দোলনের কারণে পুরো ক্যাম্পাস কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং চলমান পরীক্ষাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এক থেকে দুই মাস আগে নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো এখন দিতে হচ্ছে তাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজ্ঞান অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, “শিক্ষকদের পদোন্নতির আন্দোলন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবির পক্ষে ছিল। তবে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শিক্ষকরা তাতে কর্ণপাত করেননি। অবশেষে তাদের আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মূল্যবান সময় হারিয়ে গেছে।”
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী রিপন মণ্ডল বলেন, “শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে ভোগান্তিতে ফেলা মোটেও উচিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত যদি সেই নীতিমালাই মেনে নিতে হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের এতদিন জিম্মি করে রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? ভবিষ্যতে কোনো আন্দোলনের বোঝা যেন শিক্ষার্থীদের কাঁধে না পড়ে।”
মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, “এটি মেনে নেওয়া হয়েছে কারণ আড়াই বছর ধরে বিষয়টি ঝুলে ছিল। একপ্রকার আমাদের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছিল। এটি না মানলে আমাদের অনেক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেত। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে এবং বিশ্ববিদ্যালয় সচল রাখার স্বার্থেই আমরা এটি মেনে নিয়েছি।”
এ বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, “অভিন্ন নীতিমালা শিক্ষকরা আগেই মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি সঠিকভাবে সমাধান করা যায়নি বলেই এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল।”
সার্বিক বিষয়ে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, “অভিন্ন নীতিমালার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখানে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় রয়েছে, তাদের কাছ থেকেই আমাদের সহযোগিতা নিতে হবে। তারা যদি এটিকে আইনসংগত বলে, তাহলে আমরা এটিকে অবৈধ বলতে পারি না। ইউজিসি যেহেতু অভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করতে বলছে, তাই এখানে বিকল্প কোনো পথ নেই।”
ববি প্রতিনিধি 


















