২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ২১ জন শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সিন্ডিকেট। একই ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পূর্বে দেওয়া শাস্তিও আপিলের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
রোববার (১৫ জুন) বিকেল ৪টা থেকে পরদিন ভোর পৌনে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে প্রায় ১৩ ঘণ্টাব্যাপী সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। নয়জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তার পদাবনতি ও বেতন অবনমন করা হয়েছে। দুইজন শিক্ষককে সতর্কীকরণ এবং সাতজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে প্রভাষক পদে এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার বেতন নিম্নধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আগামী পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং শর্তসাপেক্ষে দুই বছর পর পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ মামুনকে সতর্কীকরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ড. এ মামুনকে আগামী পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আইবিএ-জেইউর সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহিরুল ইসলাম খন্দকার, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার খসরু পারভেজ এবং সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তীকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দীর্ঘ আলোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান এবং কোনো অপরাধী যেন দায়মুক্তি না পান, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯ জন শিক্ষক ও দুইজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করেই সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত নেয়।
এ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও কোষাধ্যক্ষের ভূমিকাও উঠে এসেছে। তাদের বিষয়ে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একই ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পূর্বে দেওয়া শাস্তিও আপিলের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। আজীবন বহিষ্কৃত ২১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৮ জনের শাস্তি দুই বছর এবং ৫ জনের শাস্তি এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
দুই বছরের জন্য বহিষ্কৃত ৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬ জন অব্যাহতি পেয়েছেন। সনদ বাতিল হওয়া ১২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ জনের সনদ এক বছরের জন্য এবং ৩ জনের সনদ দুই বছরের জন্য বাতিল রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে এক বছরের জন্য সাময়িক বহিষ্কৃত দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনের শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে এবং একজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ হল সংসদের ভিপি মো. সিফাতুল্লাহ বলেন, শাস্তি যথেষ্ট কঠোর হয়নি এবং এতে অভিযুক্তদের ক্যাম্পাসে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শাস্তি কমানো ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আশিকুর রহমান বলেন, সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় লঘুদণ্ড ভবিষ্যতে অপরাধকে উৎসাহিত করতে পারে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
সিন্ডিকেটের এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ঘটনায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আপিল ও তদন্ত প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশের নিষ্পত্তি হয়েছে।
kalprakash.com/SAS
জাবি প্রতিনিধি 



















