বাংলাদেশ ০৪:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
শিরোনামঃ
Logo পাকিস্তান নৌবাহিনীর নতুন শক্তি: করভেটে যুক্ত হলো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা Logo গাজাগামী ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে ইসরায়েলি আচরণ ‘জঘন্য’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’—কানাডার কঠোর নিন্দা Logo হামেস রদ্রিগেজের নেতৃত্বে ২০২৬ বিশ্বকাপের দল ঘোষণা কলম্বিয়ার Logo ইসরায়েলকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ক্যানসার’ আখ্যা দিলেন খামেনি Logo ঈদকে ঘিরে কোনো সুনির্দিষ্ট নাশকতার হুমকি নেই: র‍্যাব ডিজি Logo ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা এনপিটি-বিরোধী: রুশ প্রতিনিধি উলিয়ানভ Logo সৈয়দপুর ফেয়ার পার্কে আজ শুরু হচ্ছে গ্রামীণ ও কুটির শিল্প মেলা-২০২৬ Logo হঠাৎ পিছিয়ে গেল পূজা চেরীর ‘নাকফুলের কাব্য’ সিনেমা Logo বিয়ের ১০ বছর পর যমজ সন্তানের মা হলেন অভিনেত্রী দিব্যাঙ্কা ত্রিপাঠী Logo ২৭০ কোটি টাকার নটিং হিল সম্পত্তি ঘিরে বিতর্কে সোনম কাপুর

অর্ধশত পণ্যে বাড়তে পারে ভ্যাট-শুল্ক, বাড়বে নিত্যপণ্যের দামও

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় অর্ধশত পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে গতি আনা হলেও অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরই পড়বে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চাল, গম, ভোজ্য তেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, চিনি ও চায়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর বর্তমান ০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ করা হতে পারে।

এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশা, উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর চিন্তাও রয়েছে। অনলাইন মার্কেটিং এজেন্টদের কমিশনের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক পণ্যে ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, বাড়তি রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য নতুন করে পরোক্ষ করের বোঝা উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে গত তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)–এর মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, মানুষ নতুন অর্থবছরে স্বস্তি প্রত্যাশা করছে। তাই কর ও ভ্যাট নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত, যাতে তা জনগণের জন্য সহনীয় হয়।

সরকার নতুন বাজেটে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট থেকে এবং ৬৭ হাজার কোটি টাকা শুল্ক থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত পরোক্ষ কর নির্ভরতা আয়বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট–এর নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, পরোক্ষ করের বোঝা মূলত নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে, অথচ ধনীরা তুলনামূলক কম চাপ অনুভব করেন। এতে আয়বৈষম্য আরও গভীর হয়।

তিনি জানান, দেশের গিনি সহগ ২০১০ সালের ০ দশমিক ৪৫৮ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ০ দশমিক ৪৯৯৯-এ পৌঁছেছে, যা সম্পদ বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে এনবিআর নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় আট লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত করদাতা থাকলেও আগামী চার বছরে তা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ভ্যাট ফাঁকি রোধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে এবং করজাল সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতি ও বাস্তবায়ন ঘাটতি দূর করা গেলে বর্তমানের তুলনায় তিন গুণ বেশি ভ্যাট আদায়ের সুযোগ রয়েছে। তবে কর প্রশাসনের দুর্বলতা, দুর্নীতি ও কর অব্যাহতির সংস্কৃতির কারণে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০১১ সালের ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এনবিআর প্রতিবছরই পরোক্ষ করের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এদিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যাটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। অক্সফাম বাংলাদেশ–এর সহায়তায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দরিদ্র মানুষের আয়ের ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে ব্যয় হয়, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও তা যেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে সরকারকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।

kalprakash.com/SS
ট্যাগ সমূহ:
জনপ্রিয় সংবাদ

পাকিস্তান নৌবাহিনীর নতুন শক্তি: করভেটে যুক্ত হলো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা

অর্ধশত পণ্যে বাড়তে পারে ভ্যাট-শুল্ক, বাড়বে নিত্যপণ্যের দামও

প্রকাশিত: ০৩:৩৬:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় অর্ধশত পণ্য ও সেবায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে গতি আনা হলেও অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরই পড়বে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চাল, গম, ভোজ্য তেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, চিনি ও চায়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর বর্তমান ০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ করা হতে পারে।

এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশা, উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর চিন্তাও রয়েছে। অনলাইন মার্কেটিং এজেন্টদের কমিশনের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক পণ্যে ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, বাড়তি রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য নতুন করে পরোক্ষ করের বোঝা উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে গত তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)–এর মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, মানুষ নতুন অর্থবছরে স্বস্তি প্রত্যাশা করছে। তাই কর ও ভ্যাট নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত, যাতে তা জনগণের জন্য সহনীয় হয়।

সরকার নতুন বাজেটে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট থেকে এবং ৬৭ হাজার কোটি টাকা শুল্ক থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত পরোক্ষ কর নির্ভরতা আয়বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট–এর নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, পরোক্ষ করের বোঝা মূলত নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে, অথচ ধনীরা তুলনামূলক কম চাপ অনুভব করেন। এতে আয়বৈষম্য আরও গভীর হয়।

তিনি জানান, দেশের গিনি সহগ ২০১০ সালের ০ দশমিক ৪৫৮ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ০ দশমিক ৪৯৯৯-এ পৌঁছেছে, যা সম্পদ বৈষম্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে এনবিআর নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় আট লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত করদাতা থাকলেও আগামী চার বছরে তা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ভ্যাট ফাঁকি রোধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে এবং করজাল সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতি ও বাস্তবায়ন ঘাটতি দূর করা গেলে বর্তমানের তুলনায় তিন গুণ বেশি ভ্যাট আদায়ের সুযোগ রয়েছে। তবে কর প্রশাসনের দুর্বলতা, দুর্নীতি ও কর অব্যাহতির সংস্কৃতির কারণে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০১১ সালের ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এনবিআর প্রতিবছরই পরোক্ষ করের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এদিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যাটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। অক্সফাম বাংলাদেশ–এর সহায়তায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দরিদ্র মানুষের আয়ের ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে ব্যয় হয়, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও তা যেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে সরকারকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।

kalprakash.com/SS