বাংলাদেশ ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
আবাসন খাতে ভয়াবহ মন্দা, চাপে নির্মাণ শিল্প

আবাসন খাতে ভয়াবহ মন্দা, চাপে নির্মাণ শিল্প

দেশের আবাসন খাত বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চরম চাপের মুখে পড়েছে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো। এর প্রভাব পড়েছে রড, সিমেন্ট, ইট, বালি, পাথর, টাইলসসহ নির্মাণসংশ্লিষ্ট শতাধিক খাতে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের বাড়তি সুদহার, ডলারের অস্থিরতা এবং নির্মাণ উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবাসন খাতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা। চলমান প্রকল্পগুলোর কাজও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, পুরো আবাসন শিল্পে মাসিক ফ্ল্যাট বিক্রি ১ হাজার ইউনিট থেকে নেমে এখন ২৫০ থেকে ৩০০ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা ছিল, সেখানে অনেক প্রকল্পে উল্টো ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার। বসুন্ধরা, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। জিডিপিতে প্রায় ১৮ শতাংশ অবদান রাখা এ খাতের সংকট পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ আবাসন খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প।

রাজধানীর বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই বছরে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাংলামোটর টাইলস মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. জিয়াদ জানান, আগে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার টাইলস বিক্রি হলেও এখন দিনে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিক্রিও কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো দিন ক্রেতাই পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিক খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় আগে যেখানে ৮-৯ তলা ভবন নির্মাণ সম্ভব ছিল, এখন তা ৫-৬ তলায় সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে জমির মালিকদের মধ্যেও অনাগ্রহ বাড়ছে।

রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, পুরো খাত এখন বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বিক্রি নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে। নতুন প্রকল্পও কমে গেছে। ফলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ীরাও বড় সংকটে পড়েছেন।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আমিরুল হক জানান, চাহিদা কমে যাওয়ায় সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনতে হয়েছে। একইভাবে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, রডের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সুদহার ১৪ শতাংশে রয়েছে।

মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, উচ্চ সুদের কারণে মানুষ এখন ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণে আগ্রহ হারাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবাসন খাতের জন্য বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুবই সীমিত। সরকার চাইলে স্বল্প সুদে আবাসন ঋণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, আবাসন খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্প উৎপাদন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। তাই খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

উদ্যোক্তারা বলছেন, আবাসন ও নির্মাণ খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে কম সুদে ঋণ, কর ছাড়, সহজ অর্থায়ন এবং নির্মাণ উপকরণের বাজারে কঠোর নজরদারি জরুরি। তা না হলে দেশের আবাসন খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

kalprakash.com/SAS

জনপ্রিয় সংবাদ

আবাসন খাতে ভয়াবহ মন্দা, চাপে নির্মাণ শিল্প

আবাসন খাতে ভয়াবহ মন্দা, চাপে নির্মাণ শিল্প

প্রকাশিত: ১০:২৮:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

দেশের আবাসন খাত বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চরম চাপের মুখে পড়েছে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো। এর প্রভাব পড়েছে রড, সিমেন্ট, ইট, বালি, পাথর, টাইলসসহ নির্মাণসংশ্লিষ্ট শতাধিক খাতে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের বাড়তি সুদহার, ডলারের অস্থিরতা এবং নির্মাণ উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবাসন খাতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা। চলমান প্রকল্পগুলোর কাজও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, পুরো আবাসন শিল্পে মাসিক ফ্ল্যাট বিক্রি ১ হাজার ইউনিট থেকে নেমে এখন ২৫০ থেকে ৩০০ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা ছিল, সেখানে অনেক প্রকল্পে উল্টো ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার। বসুন্ধরা, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। জিডিপিতে প্রায় ১৮ শতাংশ অবদান রাখা এ খাতের সংকট পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ আবাসন খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প।

রাজধানীর বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই বছরে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাংলামোটর টাইলস মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. জিয়াদ জানান, আগে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার টাইলস বিক্রি হলেও এখন দিনে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিক্রিও কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো দিন ক্রেতাই পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিক খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় আগে যেখানে ৮-৯ তলা ভবন নির্মাণ সম্ভব ছিল, এখন তা ৫-৬ তলায় সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে জমির মালিকদের মধ্যেও অনাগ্রহ বাড়ছে।

রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, পুরো খাত এখন বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বিক্রি নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে। নতুন প্রকল্পও কমে গেছে। ফলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ীরাও বড় সংকটে পড়েছেন।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আমিরুল হক জানান, চাহিদা কমে যাওয়ায় সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনতে হয়েছে। একইভাবে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, রডের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সুদহার ১৪ শতাংশে রয়েছে।

মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, উচ্চ সুদের কারণে মানুষ এখন ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণে আগ্রহ হারাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবাসন খাতের জন্য বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুবই সীমিত। সরকার চাইলে স্বল্প সুদে আবাসন ঋণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, আবাসন খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্প উৎপাদন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। তাই খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

উদ্যোক্তারা বলছেন, আবাসন ও নির্মাণ খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে কম সুদে ঋণ, কর ছাড়, সহজ অর্থায়ন এবং নির্মাণ উপকরণের বাজারে কঠোর নজরদারি জরুরি। তা না হলে দেশের আবাসন খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

kalprakash.com/SAS